Santiniketan

Rabindranath Tagore: ১৩৪৮-এর ১লা বৈশাখ, অসুস্থ শরীরে নিজের শেষ জন্মদিনের উৎসবে এলেন রবীন্দ্রনাথ

১৩৩৩ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ, কবির  (Rabindranath Tagore) ৬৫তম জন্মদিন। এদিন বার্ধক্যভারে জীর্ণ বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর স্নেহের রবির জন্য আশীর্বাণী সম্বলিত প্রশস্তিকা রচনা করলেন ___

“জন্মদিবসে আজি তোমার।

ধর উপহার বড় দাদার।।

প্রকাশিল লীলা অতি অপূর্ব

কবি যবে দিলা গীত অঞ্জলী

বলিলা জননী স্নেহরসে গলি,

‘কত আর আমি বিদেশে ঘুরব।

এসেছিস তুই শুভ মুহূর্তে

নিয়ে চল মোরে পুণ্য ভারতে,

শান্তিসসন সে আমার।’



সেবারের জন্মোৎসবে গুরুদেব (Rabindranath Tagore)  উত্তরায়ণের উত্তরদিকে প্রতিষ্ঠা করলেন পঞ্চবটী, সেটাই ছিল “বৃক্ষরোপণ” অনুষ্ঠানের সুচনা যা আজও অব্যাহত। তবে বৈশাখের বদলে তা গুরুদেবের তিরোধান দিবস বাইশে শ্রাবণে। সেবার কবির জন্মোৎসবের শুভ সূচনা শঙ্খধ্বনি ও মাঙ্গলিক মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে দিয়েই হয়। পণ্ডিত বিধুশেখর শাস্ত্রী মহাশয় স্বয়ং গুরুদেবকে মঞ্চে নিয়ে আসেন। কবির কয়েকটি প্রিয় গানের পরে ইতালির রাজদূত ও তাঁর পত্নী কবিকে অধিবাসীদের পক্ষ থেকে সম্বর্ধনা জানান। সম্বর্ধনা জানান ফরাসী রাজদূত, চৈনিক অধ্যাপক মিস্টার লিম্, আয়ারল্যাণ্ডের অধিবাসীদের পক্ষ থেকে Dr. James ও S. Kazin। এছাড়াও আনন্দবাজার পত্রিকা থেকে তাঁকে শ্রদ্ধার্ঘ্য জ্ঞাপন করা হয়। আরও পড়ুন- “আজ প্রাতে আমার জন্মদিন উৎসব”

একথা খুব সহজেই অনুমান করা যায় যে গুরুদেবের দীপ্তোজ্জ্বল প্রতিভা, প্রতিভাত হয়েছিল বিশ্বের দরবারে, প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেছিল অনির্বচনীয়লোকে, প্রচার করেছিল শিল্পের অমোঘ নান্দনিকতা। ১৯২৮-এর রবীন্দ্রজন্মোৎসব মহাসমারোহে কলকাতার বিচিত্রা ভবনে অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের আকর্ষণ শুধু বহুসংখ্যক গণ্যমান্য অতিথি সমাগম নয়, এই উপলক্ষে বিশেষ আকর্ষণ – কবির তুলাদান। তুলাদান হিন্দুধর্মের এক বিশেষ শাস্ত্রীয় বিধান। দেহের সমপরিমাণ ওজনের স্বর্ণ, রৌপ্য বা ধনরাজি ব্রাহ্মণদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়ে থাকে।



গুরুদেবের ক্ষেত্রেও এই ব্যবস্থা হল, তাঁর দেহের ওজনের সমপরিমাণ গ্রন্থ বিশ্বভারতী থেকে অন্যান্য পাবলিক লাইব্রেরি ও প্রতিষ্ঠানে, দানের জন্য উৎসর্গ করা হয়। সেই অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেছিলেন রবীন্দ্র-সমসাময়িক নাট্যকার তথা গীতিকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সুযোগ্য পুত্র দিলীপকুমার রায়, কবির “স্নেহের মন্টু”। আরও পড়ুন- শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের প্রথম জন্মদিন পালিত হয় ১১০ বছর আগে

এরপরেও কেটে গেছে আরও ১৩টা বছর। সুদূর পারস্যে হয়ে গেছে গুরুদেবের জন্মোৎসব পালন। অবশেষে এল ১লা বৈশাখ ১৩৪৮ [ইং ১৪ এপ্রিল ১৯৪১], নববর্ষের দিনে পালিত হল কবির শেষ জন্মোৎসব। অসুস্থ শরীরে কবি উৎসবে অংশগ্রহণ করলেন। আচার্য্য ক্ষিতিমোহন সেন পাঠ করলেন মানুষের প্রতি কবির শেষ বাণী “সভ্যতার সংকট।”



গুরুদেব আশ্রমবাসীদের আশীর্বাণীতে লিখলেন, “আশ্রমবাসী কল্যাণীয়গণ, তোমরা আজ আমাকে অভিনন্দন উপহার বহন করে এনেছ। পরিবর্ত্তে আমার কাছ থেকে আশীর্ব্বাদ প্রার্থনা জানিয়েছ। প্রত্যহ নীরবে আমার আশীর্ব্বাদ তোমাদের প্রতি ধাবিত ও প্রবাহিত হয়েছে, দীর্ঘকাল নিরন্তর তোমাদের অভিষিক্ত করেছে। আমার আশীর্ব্বাদ আজ নূতন বেশে তোমাদের কাছে উপস্থিত হউক, সুন্দর বেশে তাকে তোমরা বরণ কর। জন্মকালে আমরা যে আত্মীয় লাভ করি, তার মধ্যে কোনও চেষ্টা নাই, জীবনলক্ষ্মীর সে অযাচিত দান, তার মধ্যে আমাদের কোনও গৌরব নাই। তারপরে জীবনযাত্রার পথে পথে যদি আত্মীয় সংগ্রহ করতে পারি, সেই তো আশ্চর্য্য, সেই তো গৌরবের বিষয়, সেই আত্মীয়তা আরও গভীর, অকৃত্রিম, মূল্য তার অনেক বেশী, আশীর্ব্বাদ সেই তো বহন করে আনে। আজকে তোমাদের সকলের হৃদয়ের দান বিধাতার আশীর্ব্বাদরূপে আমার কাছে উপস্থিত। এ এক আশ্চর্য্য ঘটনা। ……আমার মত সৌভাগ্য অতি অল্প লোকেরই হয়েছে৷ শুধু যে আমার স্বদেশবাসীরা আমাকে ভালোবেসেছে তা নয়, সুদূর দেশের অনেক মনস্বী, তপস্বী, রসিক আমাকে অজস্র আত্মীয়তা দ্বারা ধন্য করেছেন। জানি না, আমার চরিত্র ও কর্মে তাঁরা কি লক্ষ্য করেছেন। সকলের এই স্নেহ মমতা সেবা আজ আমি অন্তরের মধ্যে গ্রহণ করি। প্রণাম করে যাই তাঁকে যিনি আমাকে এই আশ্চর্য্য গৌরবের অধিকারী করেছেন।” আরও পড়ুন-২৫ বৈশাখ ও স্মৃতির মোড়কে শান্তিনিকেতন

সেই জন্মদিনে কবি আশ্রমবাসীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “সংসারে বড় জিনিস হচ্ছে প্রীতি, খ্যাতি নয়। নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি যখন তোমাদের কাছ থেকে প্রীতি ভালোবাসা পাই।”



মানুষের প্রতি কবির এই শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অটুট ছিল। শান্তিদেব ঘোষ মহাশয় তাঁর ‘রবীন্দ্রসংগীত’ গ্রন্থে লিখেছেন, “… তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, আপনি নিজের জন্মদিন উপলক্ষে কবিতা লিখেছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন অথচ একটা গান রচনা করলেন না, এটা ঠিক মনে হয় না। এবারের পঁচিশে বৈশাখ সমস্ত দেশ আপনার জন্মোৎসব করবে, এই দিনকে উপলক্ষ করে একটি গান রচনা না হলে জন্মদিনের অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ হয় না। … তিনি রাজি হয়ে জন্মদিনের কবিতাগুলি সব খুঁজে আনতে বললেন দপ্তর থেকে।”

১৯৩১ সালে রচিত পঁচিশে বৈশাখ’ কবিতার তিনটি স্তবক নিয়ে রচনা করলেন তাঁর জীবনের শেষ গান, যা রবির উদয়সংগীত____

“হে নূতন দেখা দিক আর-বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ।”

এই গান রচনার পর কেটে গেছে ৭৯টা বছর। বয়স বাড়লেও সেই গান আজও চিরনবীন, চীরন্তন দীপ্তিতে উদ্ভাসিত পবিত্র-ধ্বনি, জন্মজন্মান্তরের আহ্বান মন্ত্র।

 

Post Author: bongmag

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।