Bsanta Utsab

স্বস্তিকাদি গাইছেন “নিবিড় অমা তিমির হতে বাহির হল”, গৌর প্রাঙ্গণের আকাশে তখন মেঘ সরে চাঁদ উঠছে__ এভাবেই আমার বসন্তকে দেখা

গৌরব চৌধুরী

১৭ বছর আগে তিনি পড়তে এসেছিলেন শান্তিনিকেতনে। তার আগে টিভিতে এখানকার বসন্ত উৎসব দেখা। পড়ার প্রথাগত পাঠ ফুরোলেও গুরুদেবের মাটির টানে থেকে গিয়েছেন। দেখতে দেখতে ১৭টা বসন্ত কাটছে, এই মায়ার টান ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার কথা ভাবতেই পারেন না, তিনি সংগীতভবনের প্রাক্তনী গৌরব চৌধুরী। শান্তিনিকেতনের পড়ুয়াদের প্রিয় বন্ধু, দাদা, ভাই। দাদা দিদিদের প্রিয় ছাত্র। bongmag.com-এর সঙ্গে ভাগ করে নিলেন তাঁর পরম পাওয়া বসন্তকে।


আমি বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম। গানের ছাত্র ছিলাম না। গান গাইতে ভালবাসতাম, যেমনটা ছোটবেলায় হয় আর কি। শান্তিনিকেতনে আসার পরে দেখলাম বসন্ত উৎসবের সমারোহ। আগে তেমন ধারণা ছিল না, যা দেখার টিভিতেই দেখেছি। শান্তিদেব ঘোষের গান শুনেছি। স্বস্তিকাদির গানও শুনেছি। আমরা যেটা ছোটবেলায় দেখতাম তা হোলি। এই বসন্ত উৎসব শান্তিনিকেতনের বাইরে সেভাবে দেখিনি। কলকাতায়ও যে বিশেষ বসন্ত উৎসব হত এমনটা নয়। গত পাঁচ সাত বছর ধরে এই বসন্ত উৎসব শব্দটা বাঙালি ব্যবহার করছে। আগে বাইরে থেকে লোকজন আসতেন বসন্ত উৎসবে আনন্দ করতেন চলে যেতেন। তবে তারও ১১ বছর আগে আমি এখানে এসেছি।


প্রথমে আমের মুকুলের গন্ধ কেমন লাগে, তা শান্তিনিকেতনেই পেয়েছি। আম্রকু্ঞ্জের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় সেই গন্ধ নাকে আসছে। এখানেই পূর্ণচন্দ্র দেখেছি, গৌর প্রাঙ্গনের একদিকে সিংহসদন, অন্যদিকে পাঠভবনের বারান্দা, পিছনে গৌর প্রাঙ্গণের মঞ্চ, সামনে পুরনো ঘণ্টাতলা। আর ঠিক বটগাছের উপর থেকে চাঁদটা দেখতে পাচ্ছি। স্বস্তিকাদি মঞ্চে গান গাইছেন “নিবিড় অমা তিমির হতে বাহির হল জোয়ার স্রোতে শুক্লরাতে চাঁদের তরণী।” তখনই আমরা এক বন্ধু বলল, গৌরব আকাশের দিকে দ্যাখ, দেখলাম আকাশে মেঘের একটা টুকরো। তার ভিতর থেকে ধীরে ধীরে চাঁদ বেরিয়ে আসছে। সেই প্রথম ভিস্যুয়ালাইজ করতে শিখলাম রবীন্দ্রনাথের গান কীভাবে লেখা হয়। এইভাবে আমি বসন্তকে দেখেছি। আরও পড়ুন-‘দোল পূর্ণিমার আলো মেখে হাসছে আশ্রম মাঠ, নাচে গানে জমে উঠেছে আড্ডা’__ ফিরে দেখা বসন্ত উৎসব


তারপর “ও মঞ্জরী ও মঞ্জরী আমের মঞ্জরী। আমার হৃদয় উদাস হয়ে পড়ল কি ঝরি।” কীভাবে আমের মুকুল একটা একটা ঝরে পড়ছে, তার যে আওয়াজ। বকুল বিথির পাশ দিয়ে যেতে যে বকুলের গন্ধ, এটা প্রথম শিখি শান্তিনিকেতনে। এইভাবেই শান্তিনিকেতনকে পাওয়া। আসলে রবীন্দ্রনাথকে আমরা খুব সহজে পেয়ে গেছি। তাই মর্মটা উপলব্ধি করতে পারি না। “যে কেবল পালিয়ে বেড়ায় দৃষ্টি এড়ায় ডাক দিয়ে যায় ইঙ্গিতে। সে কি আজ দিল ধরা বসন্তেরই সঙ্গীতে।” এইখানেই প্রশ্নটা, আমরা ভেবে দেখলাম না দ্রুতলয়ে গানটা গেয়ে গেলাম। যদি গানের দিক থেকে ধরি তাহলে এমন দাঁড়ায়। পরের লাইনটা, “ধেয়ানের বর্ণছটায় ব্যথার রঙে মনকে সে রয় রঙ্গীতে।” ব্যথার রঙে মন রেঙে উঠছে। এ জিনিস কি যার তার হাতে লেখা হতে পারে?


একদিকে বলছি বসন্ত এসে গেছে, আধুনিক গানও তো হয়েছে শুনেছি।  কিন্তু সেই যে বসন্ত ফিরে এল, হৃদয়ের বসন্ত ফুরায়। জীবন থেকে একটা বসন্ত চলে গেল। বসন্ত তো এসেছে ঠিকই। তবে সেখানে কি শুধু ফোটা ফুলের মেলাটাই থাকবে? ঝরা ফুলের খেলা থাকবে না? “তোমার বাস কোথা যে পথিক ? ওগো তুমি সর্বনেশে তো। আমার বাস কোথা যে জানো নে কি? শুধাতে হয় সেকথা কি? ও মাধবী। হয়তো চিনি হয়তো চিনি হয়তো চিনি নে। মোদের বলে দেবে কে? ও চাঁপা ও করবী।” বসন্তের সময় কি কি ফুল ফোটে তা গানের মধ্যেই পেয়ে যাচ্ছি। এই যে শুক্লাপঞ্চমীর চাঁদকে দোলা দেবে কে? সে দেবে নদীর জল, সরোবর। সেখানে তো হাওয়া, হাওয়াই তো ঢেউ তোলে। অর্থাৎ চাঁদকে দোলা দেয়। আগে তো সেটা শিখিনি, কিন্তু শান্তিনিকেতন শিখিয়েছে কীভাবে দোল বুঝতে হয়। দোলকে শিখত হয়, দোলকে দেখতে হয়। এ দোলা তো রঙের নয়, মনের। আগে মনের সৌন্দর্য। তারপর বাইরের সৌন্দর্য। আমার কাছে বসন্ত উৎসব দোরোখা শালেরই মতো। সুখ স্মৃতির পাশাপাশি দুঃখও যেখানে মিশে আছে। আরও পড়ুন-‘রবীন্দ্রনাথ চাইতেন শান্তিনিকেতনকে ছড়িয়ে দিতে, পাড়ায় পাড়ায় বসন্ত উৎসব গড়ে উঠুক’


বসন্ত উৎসবের সুখস্মৃতির ডালিতে রয়েছে থাবলচুম্বি, এটি হত সংগীতভবনে। মণিপুরী উৎসবের একটা অংশ এই থাবলচুম্বি, মাঝখানে ক্যাম্প ফায়ারের কায়দায় আগুন জ্বালিয়ে গোল করে ঘিরে নৃত্য। মণিপুরী নৃত্যশৈলি বলা যেতে পারে এই থাবলচুম্বিকে। এই নাচের ভঙ্গী যেটি আমাদের জিতেনদা শেখাতেন। অনেকটা ধামায়িল নাচের মতো, তার সঙ্গে আদিবাসী নৃত্যের মিল রয়েছে। কাঠের স্তূপ করে তাতে আগুন দেওয়া হত। এরপর সেই আগুনকে ঘিরে শুরু হত নাচ। সংগীতভবনের যে প্রাঙ্গন, তার মাঝখানে হত এই নাচ। যেখানটা এখন ফুলের টবে সাজানো থাকে। সংগীতভবনের সিনিয়র জুনিয়র যারা তারা তো নাচ করতই। আমরা যারা গান গাইতাম, একটু নাচ করার ইচ্ছে যাদের থাকত, তারাও ঢুকে পড়ত ওই দলে। শুধু বাজনাটা বাজাতেন মণিপুরী নৃত্যের হেমন্তদা, বোচাদা, আজ আর বোচাদা নেই। জিতেনদা। তাঁরা ঢোল, মণিপুরী খোল বাজাতেন। চতুর্মাতৃক বা ত্রিমাতৃক ছন্দে বাজত বাজনা। বাজনাকে অনুসরণ করে হাতটাকে একবার ভিতরে একবার বাইরে করে আগুনকে ঘিরে আমরা নাচ করতাম। এই থাবলচুম্বি হত বসন্ত বন্দনার ঠিক আগে। নাচ শেষ হলেই বসন্ত বন্দনা শুনতে যেতাম গৌর প্রাঙ্গণে। খাবলচুম্বি এখন আর হয় না। এটি বেশ মজার ছিল,  কাঠের জন্য যেতাম নাট্যঘরের পিছনের দিকের জঙ্গলে। সেখান থেকে শুকনো কাঠ কুড়িয়ে জমা করতাম অনেক আগে থেকেই। আরও পড়ুন-দোল এলেই ভয় হয়, উন্মত্ত জনতার ভিড়ে একলাটি শান্তিনিকেতন


নৃত্যনাট্যের স্থান পরিবর্তনটা একটা বড় ফ্যাক্টর। আগে তো হত গৌর প্রাঙ্গণে হত। এখন স্থান পরিবর্তন হয়েছে। ২০০৪ থেকে ২০২০, এই ১৭টা বছরে কি কি নৃত্যনাট্য হয়েছে স্মৃতিতে রয়েছে। যেমন ২০০৪-এ গৌর প্রাঙ্গণ মঞ্চে হল “শ্যামা”। ২০০৫-এ “ভানুসিংহের পদাবলী”। ২০০৬-এ “চিত্রাঙ্গদা”। ২০০৭-এ “শাপমোচন”। “শাপমোচন” মনে আছে এই কারণে যেহেতু রিহার্সাল শুনতে সংগীতভবনে এসেছিলেন সুচিত্রা মিত্র। ওঁর তখন অনেক বয়স। স্বস্তিকাদি হাত ধরে নিয়ে এলেন মঞ্চে। সেখানে সবাই বসে আছে, আমার গান শুরু হবে। তাঁর আগে আভেরীদি গাইছেন, ‘ভরা থাক স্মৃতি সুধায়’। এবার আমার গান “জাগরণে যায় বিভাবরী।” সুচিত্রা মিত্র ততক্ষণে চেয়ারে বসেছেন। বুক ঢিপঢিপ করছে। গান তো গাইতেই হবে। গান গাইলাম, অরূপদা ছিলেন। আমাদের মাস্টারমশাই অরূপরতন বন্দ্যোপাধ্যায়। আমার পিঠে টোকা মেরে বললেন, গৌরব দ্যাখ সুচিত্রাদি ডাকছেন। কি জানি ভুল গাইলাম কিনা। আমি তাকালাম ওঁর দিকে, দেখলাম ইশারা করছেন তাঁর কাছে যাওয়ার জন্য।


প্রণাম করতে যেতেই কিছুতেই প্রণাম নেবেন না। বললেন, “আমার প্রণাম নিয়ে কী হবে। এই মাটিতে কে হেঁটে গেছেন, এই মাটিটাকে প্রণাম করো। এই মাটিতে দাঁড়িয়ে আমার আশীর্বাদে কিছু হবে না। এই মাটি মাথায় নাও তোমার কল্যাণ হবে।” সুচিত্রা মিত্র আশ্রমে খালি পায়ে আসতেন। বলতেন, “যে মানুষটা এখান থেকে হেঁটে গেছেন, তাঁর আশ্রমে আমি চটি পরে হাঁটব?” এমন সূর্যকে কাছ থেকে দেখে কেউ হারাতে চায়? যখন প্রণাম করলাম, তখন জানতে চাইলেন কোন ইয়ার হল। দেখছি চোখ থেকে জল পড়ছে, বলছেন “কতদিন পর তোদের গান শুনলাম কানে আরাম লাগল। কলকাতায় এলে দেখা করবি। ঈশ্বর তোর মঙ্গল করুক। সুরের মাঝে থাকিস।” এই মানুষগুলোকে কোথায় পাব আজকাল, এতো মণিমুক্ত।


ফিরে আসি নৃত্যনাট্য প্রসঙ্গে, ২০০৮-এ প্রথম নৃত্যনাট্য হল আশ্রম মাঠে। সেবার হল “কালমৃগয়া”। পূর্ণাঙ্গ রূপে বলা যায়। ২০ বছর আগে ১৯৮৭ সালে “শাপমোচন” হয়েছিল। আর “কালমৃগয়া”  ২০০৮-এর আগে ১৯৬৮-তে শেষবার মঞ্চস্থ হয়। মাঝে কেটেছে ৪০টা বছর। তাই “কালমৃগয়া” –র মঞ্চায়ন আমাদের কাছে দারুণ থ্রিলিং ছিল। পূর্ণাঙ্গভাবে মঞ্চস্থ হয়েছিল সেবার। ২০০৯-এ হল “চণ্ডালিকা”। সেবার আমার মাস্টার্স হয়ে গিয়েছে। এরপর অনুষ্ঠান করব বলে ফিরি ২০১০-এ, নৃত্যনাট্য “বসন্ত”। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেবার বসন্ত উৎসব হল না। সেবার সুপ্রিয় ঠাকুর রাজার ভূমিকায় অভিনয় করছিলেন। আর কবির ভূমিকায় ছিলেন সুদীপদা, স্বস্তিকাদির স্বামী। এই নৃত্যনাট্যের মঞ্চায়ন হলে ইতিহাস হত।


সংগীতভবনের প্রাঙ্গণ জুড়ে হত নাটকের রিহার্সাল। গানের দল মঞ্চে বসত। সেখান থেকে আমরা দেখতে পেতাম। ২০১১-তে আশ্রম মাঠে হল “শ্যামা”। ২০১২-তে “চিত্রাঙ্গদা”। ২০১৩-তে মেলার মাঠে নৃত্যনাট্য হল “শাপমোচন”। মধুশ্রীর ভূমিকায় পাঠ করেছিলেন স্বস্তিকাদি। আর পিএম হাসপাতালের ডাক্তার প্রদীপ গাঙ্গুলী অরুণেশ্বরের ভূমিকায় পাঠ করেন। আমরা গানের দল সাধারণত মঞ্চে একটু পিছনে বসি। আমাদের সামনেই হয় মঞ্চায়ন। মেলার মাঠে আমদেরও স্থান পরিবর্তন হল। যেহেতু একটা পাঠ করার ব্যাপার আছে, তাই দেখতে হবে। সেজন্য ব্রিটিশ অপেরা স্টাইলে আমরা মঞ্চের মুখোমুখি অপেক্ষাকৃত নিচু জায়গায় বসেছিলাম। ২০১৪-তে আবার চলে এল আশ্রম মাঠে, এবার “মায়ার খেলা”। ২০১০-এর বসন্ত উৎসবের জন্য তৈরি নৃত্যনাট্য “বসন্ত” হল ২০১৫-তে। ২০১৬-তে আবার “চিত্রাঙ্গদা”। ২০১৭-তে “তাসের দেশ”। ২০১৮-তে “চণ্ডালিকা”। ২০১৯-এ “শ্যামা”। আর এ বছর হওয়ার কথা ছিল “চিত্রাঙ্গদা”। আরও পড়ুন-ফেলে আসা মেয়েবেলা ও মন কেমনের বসন্ত উৎসব


২০১৬-তে বসন্ত বন্দনায় ছাত্রছাত্রীরা প্রথম গান গাইতে শুরু করি। প্রথমে রবীন্দ্রনাথের গান, তারপর মণিপুরী রাশ, কথাকলি, বুদ্ধদা  এস্রাজে বাজিয়েছিলেন বসন্ত মুখর। তখন বসন্ত উৎসবের প্রসেশনের নাচেও থাকতাম। কাঠে কাঠে ঠোকাঠুকি আর কি, আমরা তো সেভাবে নাচ জানতাম না। আমাদের প্রসেশন শুরু হত ছাতিমতলা থেকে। ছাতিমতলা হয়ে ডানদিকে বকুলবিথি। শান্তিনিকেতন গৃহ বাঁদিকে রেখে আম্রকুঞ্জ মাধবীবিতান হয়ে পুরনো ঘণ্টাতলা, সেখান বাঁদিকে সিংহসদন, ডানদিকে পাঠভবনের বারান্দা পেরিয়ে চৈতিতে এসে প্রসেশন শেষ। আবার যখন আশ্রম মাঠে করলাম, তখন আমাদের নাচ শুরু হল শালবিথি থেকে।

আগে কিন্তু শান্তিনিকেতনে প্রসেশন হত না। ১৯২৯-৩০ সালে প্রথম প্রসেশনে নাচ শুরু হল। শান্তিদেব ঘোষের বইয়ে এই প্রসঙ্গ পাই। তখন বসন্ত উৎসব হত আম্রকুঞ্জে। তখন গানের দল সামনে যেত, পিছনে আসত নাচের দল। বা কখনও নাচের দল সামনে থাকত। তখন ছেলেরা নাচ করতে পারতেন না। তাঁরা কলাভবনের তৈরি তালপাতার ঠোঙায় আবীর রং বেরঙের ফুল, একজনের হাতে ধূপকাঠির ঝারি নিয়ে নাচের মতো ভঙ্গী করতে করতে যেতেন। পরে নন্দলাল বসু শান্তিদেব ঘোষ প্রমুখেরা ঠিক করেন প্রসেশনের জন্য এক ধরনের নাচ করা হোক। ছেলেরা একদিকে, মেয়েরা আর একদিকে, পাশে পাশে নাচ করতে করতে যেতেন।

সেই সময় গানের দলের সঙ্গে নাচের দলে গলা মিলত না। তখন মাইক্রোফন এসে গেছে। ঠিক হল গানের দল মঞ্চে বসবে। আর প্রসেশনের ছেলেমেয়েরা শালবিথিকে ঘিরে নাচ করতে করতে অনুষ্ঠানের জায়গায় এসে বসবে। এইভাবে প্রসেশনের নাচ এল। পুরুষদের ছিল রাইবেশে নাচ। এখন আমরা দেখি পাঠভবনের বাচ্চারা হাতে তালি দিয়ে নাচ করতে করতে প্রসেশনে এগিয়ে যাচ্ছে। ওটা রাইবেশের ধরণ বলা যেতে পারে। এইভাবে বিভিন্ন নাচের ভঙ্গিকে ব্যবহার করেই তা তৈরি হয়।

আর বসন্ত উৎসবের প্রস্তুতি ঘিরে আমাদের উত্তেজনা থাকত তুঙ্গে। পাঞ্জাবি পরতে হবে, পাঞ্জাবী ছাড়া গান বেরোবে না। সকাল দশটা থেকে রিহার্সাল শুরু হয়ে বেলা দুটো গড়িয়ে গেল। আবার বিকেল চারটে থাকে রাত নটা। দেড়মাস ধরে এমন চলতে থাকলে জীবনের রীতিটাই বদলে যায়। যে মুহূর্তে মঞ্চে বসে শেষ গানটা গাইতাম তখন দুঃখ দুঃখ ভাবটা আসত। আশ্রম সংগীত গাওয়ার পর চোখে জল। ভাবতাম কাল থেকে কী হবে, আর তো রিহার্সাল নেই। আবারও এক বছরের অপেক্ষা।  তখন বড় কষ্ট হয়। সকালবেলা উঠে কী যেন নেই ফাঁকা ফাঁকা। সে কষ্ট বলে বোঝানো যায় না। যারা অনুষ্ঠান করে তারাই শুধু এটা অনুভব করতে পারে। যখন গান গাইছি তখনও কিছু মনে হয় না। যখন শেষ হল তখনই বুঝলাম, যার মধ্যে এতক্ষণ ছিলাম তা স্মৃতিতে চলে গেল। অতীত হয়ে গেল। চাইলেই তো আর এই দিনগুলোকে ফিরে পাব না।

বসন্তের এই অনুষ্ঠান হয়ে যাওয়ার পর মন পড়ে থাকত এখানেই। রাতে খাওয়াদাওয়ার পর কলাভবনের বন্ধুদের সঙ্গে চলে আসতাম গৌর প্রাঙ্গণে। তখন এত সিকিওরিটি ছিল না। রাত দেড়টা দুটো প্রায়, আকাশে পূর্ণ চন্দ্র। গোটা আশ্রম ভেসে যাচ্ছে চাঁদের আলোয়। শালবনে হাওয়া দিচ্ছে। পিছনদিকে কয়েদবেলের গাছ আছে, তার ডালটা ঝুঁকে পড়েছে। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। আমবনের ভিতর থেকে পাতার আওয়াজ আসছে। বটগাছের ঝুরি দুলছে। এসব কি অন্য কোথাও পাব? আমরা যারা হস্টেলে থাকতাম কলাভবনের বন্ধুরা মিলে এই পূর্ণিমা রাতে সোনাঝুরি চলে যেতাম। সেখানে পুরোনো বাঁধের নিচে নেমে খোয়াইয়ের মাঝে বসে একটার পর একটা বসন্তের গান, তখন মধ্যরাত। চারদিক থেকে ইকো হচ্ছে, পেঁচা ডাকছে, কি অদ্ভুত অনুভূতি। আসলে যা কিছু আমি বসন্ত উৎসবে দেখেছি, সে যদি বেদনাও হয়ে থাকে তবে তাও স্মৃতিমধুর। ভাল খারাপ তো থাকবেই, এতো সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু এখনও যা আছে, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গানে বলা যায়___ এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি। সকল দেশের রানি সে যে আমার জন্মভূমি।

Post Author: bongmag

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।