Basanta Utsab

ফেলে আসা মেয়েবেলা ও মন কেমনের বসন্ত উৎসব

এবং রূপকথা

বসন্ত পঞ্চমী যেতে না যেতেই বাতাসে ফাগুন সুর। শীতবুড়োর রুক্ষতাকে ঝেড়ে ফেলে নিজেকে সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে পলাশ। তার যে রেঙে ওঠার সময় হয়ে এল। নিজের সাজ সম্পূর্ণ করেই তো দোল পূর্ণিমায় রাঙিয়ে দেওয়ার কাজে হাত লাগাবে। পলাশ ফুটলেই আমার মনটা উড়ে যায়। সাততলা অফিসের কাচের জানলা থেকে পাক খেতে খেতে সেই অচিন গাঁ, বিষ্ণুবাটিতে। মাস্টার্স করার সময় ডিসার্টেশন পেপারের জন্য সেই সাঁওতাল গ্রামে নিত্য যাতায়াত ছিল। ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে পলাশে যত রঙ ধরে বোলপুরের রাঙামাটিও তালমিলিয়ে তপ্ত হয়ে ওঠে। ততক্ষণে ফুলের মেলায় চারিদিক পূর্ণ। রাধাচূড়া, কৃষ্ণচূড়া, কুর্চি, পলাশ। রবীন্দ্রভবনের বাগানে তখন হরেক ফুলের মেলা। ফুটব ফুটব করছে প্রিয় অমলতাস। আরও পড়ুন-“রোগ তো শরীরের হয়েছে, আমি আনন্দে আছি”

 



অমলতাস যেন ফেলে আসা মেয়েবেলা, দেখলেই দৌড়ে গিয়ে টোলপড়া গালে আদর করে দিতে ইচ্ছে করে। হাওড়া স্টেশনের নয় নম্বর প্ল্যাটফর্মে ছুটতে ছুটতে এসে চড়ে বসি প্রায় ছেড়ে যাওয়া সরাইঘাট এক্সপ্রেসে। এটি আমার ভারী প্রিয় ট্রেন। ছটা বাজতে না বাজতেই পৌঁছে দেবে লালমাটির দেশে। দোলের সময় অমলতাসের দেখা খুব একটা মেলে না, তারজন্য গুরুদেবের জন্মদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে আপত্তি নেই। বসন্তকালে সূর্য পাটে বসলেই ধীরে ধীরে তপ্ত মাটি ঠান্ডা হতে থাকে। দখিনা হাওয়া তখন মেলার মাঠের একপ্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে দৌড়ে যায়। ট্রেন থেকে নেমে এতটা বড় প্ল্যাটফর্ম জুড়ে হাঁটতে আমার বয়েই গিয়েছে। মহিলা কামরার সোজাসুজি প্রায় লোহার রেলিংয়ে একটা ফাঁকা জায়গা আছে। সিমেন্টের সিঁড়ির কয়েকটা ধাপ ডিঙিয়ে সেখান থেকেই নেমে যাই। টোটো-রিকশার ভিড়, কোলাহলের বোলপুর তখন  ভিনগ্রহের বাসিন্দা। ভিড় ঠেলে পায়ে পায়ে চলে এসেছি চৌরাস্তায়, স্কুল থেকে ফেরার পথে বাবু দাঁড়িয়ে। আমায় নিতেই এসেছে, কোথায় গোয়ালপাড়া তনয়েন্দ্র বিদ্যালয় আর কোথায় চৌরাস্তা। তবুও এসেছে, আমি আসছি যে। ওর শৈশবের হাজারো বাঁদরামোর একমাত্র সাক্ষী।



হঠাৎ করে শহুরে চাদর গায়ে জড়ানো বোলপুরকে চিনতে কষ্ট হলেও পল্লী বালকের চোখ থেকে এখনও মোছেনি সারল্য। সেই ঝিকিমিকিই তো ভরসা জোগায়। পৃথিবীতে ওলটপালট হলে রবিকবির শান্তিনিকেতনে তার দোলা লাগে, তবে খুঁজে পেতে দেখলে এখনও মোরামের মাঝে লাল চন্দনের বীজ উঁকি দেয়। সবটাই ফাঁপা নয়। বাঁধনা পরবে সাঁওতালি কিশোরী মায়ের পাঠভাঙা শাড়িখানা পরে মাথায় আমের পল্লব গুঁজে আড়চোখে হেসে ওঠে। নাকের নোলকে ঝিকমিক করে যায় পড়ন্ত বেলার রোদ্দুর। তখনও মনে হয় দিনের শেষে এটুকুর জন্যই শুধু ফিরে আসা যায়। আরও পড়ুন-একটা বৃষ্টি দিন ও ভাল-বাসার নবনীতা

 



বইমেলার পর্ব মিটতেই দোল উৎসব নিয়ে লিখতে হবে। বসের নির্দেশ শিরোধার্য, কলম তো আর চালানো হয় না বিশেষ। তাই কলমচির ভরসা এখন কিপ্যাড, সেখানে শুরু হয় শব্দের হুড়োহুড়ি। ফরমায়েশি লেখা থেকে ফুরসৎ মিললে মন কেমনের পাল্লা ভারী, বোলপুর ডাকছে। তাইতো হাইরাইজের আকাশজোড়া নীলের মাঝেও সেই তারাটিকে খুঁজে বেড়াই যে এখনও কোপাইয়ের তীরে বসে দোলপূর্ণিমার চাঁদ দেখার বায়না জোড়ে। আকাশ হওয়ার সাধ নেই, তবে বসন্তের শেষবেলায় ক্ষীণকায়া কোপাইয়ের জলে যখন আঁধার নামে তখন পঞ্চপ্রদীপ জ্বালিয়ে চাঁদ ওঠে। মনকাড়া জোছনায় ভেসে যেতে যেতে কোপাই ততক্ষণে হাজার বুটির জামদানি। এপাড়া ওপাড়ায় ঘুরে সারাদিন আবীর মেখে উচ্ছ্বল বোলপুর সবে স্নান সেরেছে। কোপাইয়ের কোল থেকেই জামদানি জড়িয়ে উঠে এল। সাধ করে টেকস্যাভি মন পাক খেতে খেতে ছুঁয়ে আসে সেই জামদানি। জমি ছাড়িয়ে পাড়, তারায় তারায় যেন মেলা লেগেছে। একরাশ চুলে মাখামাখি বোলপুরের পিঠ, আঁচল জুড়ে দোল পূর্ণিমার চাঁদ। শেষরাতের শিরশিরে বাতাস কাঁপন ধরিয়ে দেয়। দীগন্তে চোখ রেখে নতুন ভোরের অপেক্ষায় মুহূর্ত গোনে গুরুদেবের শান্তিনিকেতন।

 

Post Author: bongmag

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।