Nabaneeta DebSen

“রোগ তো শরীরের হয়েছে, আমি আনন্দে আছি”

১৯৯৬ সালে ক্লাস এইট, তখন থেকে নবনীতা দেবসেনের লেখার সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয়। তাঁর কবিতার বই ‘প্রথম প্রত্যয়’-এর কিছুটা পড়া। সেই ‘প্রথম প্রত্যয়’ ২০১৭-তে ৫০বছর ছুঁয়ে ফেলল। পড়ার তালিকায় খুব কম প্রচলিত একাঙ্ক নাটকও রয়েছে। সাহিত্যের একক অঙ্গনে নবনীতাকে বর্ণনা করা যায় না। তাঁর একহাত ধরে আছে বাল্মীকির রামায়ণ আর অন্যহাতে সংবাদ প্রতিদিনের রোববার। এই বিস্তৃতিকে মাপতে গেলে তাঁকে জানতে হবে। ভাল-বাসার বারান্দায় নবনীতার মতো সাবলীল ছন্দ সাহিত্যপ্রেমী বাঙালির পরম পাওয়া বলতে পারেন। নবনীতা যেন লক্ষবুটির বেনারসি। নিপুণ বুনটের সঙ্গে এক নরম উজ্জ্বলতা, যা পাঠককে ঋদ্ধ করবে, আলোকিত করবে, সূক্ষ ভাবনার কদর করতে শেখাবে। চোখে ধাঁধা লাগাবে না। Bongmag.com-এর জন্য সেই নবনীতা দেবসেনকে নিয়ে কলম ধরলেন তাঁর পরম ভক্ত পিনাকী গুহ।

নবনীতা দেবসেন শুধু একটা নাম নয়, ভালবাসা, আবেগ, হাসি, কান্না, এককথায় মানুষের সুকুমার বৃত্তিগুলির সমন্বয়ের নাম নবনীতা। কবি নরেন দেব ও রাধারাণীদেবীর একমাত্র কন্যা। ১৯৩৮ সালের ১৩ জানুয়ারি মকর সংক্রান্তি তিথিতে তাঁর জন্ম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাম রেখেছিলেন নবনীতা। এই নামের নেপথ্যে রয়েছে একটি ঘটনা। রাধারাণীদেবী ছিলেন বাল্য বিধবা। কবি নরেন দেবের সঙ্গে তিনি বিধবা বিবাহে আবদ্ধ হন। তখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভেবেছিলেন রাধারাণীদেবীকেই দেবেন নতুন নাম। নব জীবনে আনিতা, নবনীতা। তবে কার্যক্ষেত্রে তা ঘটেনি, তাই তাঁদের মেয়ের নাম রাখলেন নবনীতা। নবনীত শব্দের অর্থ দই। দইয়ের উপরে ভাত, কোমল। জীবনে যখন যন্ত্রণা পেয়েছেন তখন জন্মের মতোই পেয়েছেন। তবে শত যন্ত্রণাতেও স্বভাবের কোমলতা হারিয়ে ফেলেননি  নবনীতা দেবসেন। আরও  পড়ুন-একটা বৃষ্টি দিন ও ভাল-বাসার নবনীতা

জীবনকে সবসময় ক্ষমার চোখে দেখতে চেয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনে যখন যন্ত্রণা নেমে এল তখনও নিজেকে ধরে রেখেছিলেন। স্বামী অমর্ত্য সেনের সঙ্গে বিচ্ছেদ নিয়ে নিজেই বলেছেন, যার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিল, তাঁর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়নি। তবে নিজের যন্ত্রণাকে জাহির করার কোনও ইচ্ছেই তাঁর মধ্যে দেখিনি। বার বার বলেছেন, ‘আমার জীবনের যন্ত্রণা আমার নিজের থাক। সেটি নিয়ে আমিই মজা করি।’ কবি নবনীতা দেবসেনকে অনেকেই সেভাবে চেনেন না। তবে তাঁর কবিতার মধ্যেই নিজের জীবনের যন্ত্রণাকে অসম্ভব মুন্সিয়ানায় বুনেছেন। তুলনায় তাঁর ভ্রমণকাহিনী, রম্যরচনায় ব্যক্তিযন্ত্রণা ফুটে উঠেছে হীরের দ্যুতির মতো। জীবন সায়াহ্নে এসে লিখলেন “এবার তুমি মনস্থির করো”। সুনীল গাঙ্গুলির করা শেষ কাজ, নবনীতা দেবসেনের এই কবিতার বই। কিছু দিন আগেই প্রকাশিত হয়েছে। হাইকো প্যাটার্নের ছোট ছোট কবিতা ভারী চমৎকার।

এসবের বাইরেও রয়েছেন অধ্যাপিকা নবনীতা, বাংলা সাহিত্যের ছাত্রছাত্রীদের কাছে যিনি নক্ষত্র। রামায়ণ ছিল তাঁর গবেষণার বিষয়। এরপর চন্দ্রাবতীর সীতাকে নিয়ে তিনি লিখেছেন। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি ,চন্দ্রাবতী হলেন বাংলাদেশের ময়মনসিংহের কবি। তিনিও রামায়ন লিখেছেন, তবে সম্পূর্ণ করে যেতে পারেননি। সেই রচনাকে অসম্পূর্ণ রামায়ণ বলা হলেও সম্পূর্ণ সীতায়ন আমরা বলতেই পারি। কেননা কবি চন্দ্রাবতী ছিলেন বিবাহ বিচ্ছিন্না, তখনকার দিনে তো আর ডিভোর্সের তেমন চল ছিল না, স্বামী তাঁকে ছেড়ে গিয়েছিলেন। আর এই চন্দ্রাবতীই নবনীতাকে দারুণভাবে টেনেছেন। তাইতো চন্দ্রাবতীর রামায়নকে নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। আসলে বিবাহ বিচ্ছিন্না নারীদের সঙ্গে একটা আত্মগত টান অনুভব করতেন তিনি। নবনীতার লেখায় সুর্পনখার বেদনায় সহমর্মী সীতা। রামচন্দ্র ভাই লক্ষ্মণকে ঠকাচ্ছেন, আবার লক্ষ্মণ ঠকাচ্ছেন সুর্পনখাকে। লব কুশ বিগড়ে যাচ্ছে, দেখে চিন্তিত মা সীতা ছেলেদের বসুমতীর কাছে রেখে এলেন। একে তাই পুরোপুরি সীতার দৃষ্টিভঙ্গিকে কেন্দ্র করে রচিত রামায়ন বলা যেতে পারে। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়ে গেলে সেই পরিবারের পুত্র সন্তান যে দূরাবস্থার মধ্যে দিয়ে দিন কাটায়, তা নবনীতার রচনায় ফুটে উঠেছে। আজ নবনীতা দেবসেনের নশ্বর শরীরটা আমাদের সামনে নেই, তাই এমনটা বলছি ভাববেন না। বাংলা সাহিত্যের দিকপাল সুনীল গাঙ্গুলি, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের পাশেই একটা উজ্জ্বল নাম নবনীতা দেবসেন। ঠিক একইভাবে জয় গোস্বামী, শঙ্খ ঘোষদের সঙ্গে একই সারিতে কবি হিসেবে জ্বল জ্বল করেন তিনি। যখন ভ্রমণকাহিনী প্রসঙ্গে সৈয়দ মুজতবা আলির নাম করছেন, তখন তাঁর সঙ্গে নবনীতা দেবেসেনেরও নাম আসবে। ভ্রমণকাহিনীকার হিসেবে নবনীতা দেবসেন পাঠক মনে একটা স্বতন্ত্র জায়গা করে নিয়েছেন। আবার ঔপন্যাসিক নবনীতার নাম সমরেশ বসুর সঙ্গে একই সারিতে রাখতেই পারেন। সাহিত্যিক হিসেবে তিনি যে স্তরে বিচরণ করতেন তা দীক্ষিত পাঠকের কাছে অগম্য ছিল না কোনওদিনই।

তবে নিজের জীবন, রোগ ও ভুলে যাওয়া স্বভাবকে নিয়ে মজা করা নবনীতা দেবসেনকে দেখে শিখতে হয়। ওঁর জনপ্রিয়তার নেপথ্যে রয়েছে এই আত্মকৌতুক। তবে আপাত মজার মধ্যেই ফল্গু ধারার মতো বয়ে যায় এক বিবাহ বিচ্ছিন্না নারীর গল্প। তাঁকে জানতে হলে, নিজেদের জীবনকে জানতে বাঙালি মহিলাদের নবনীতা দেবসেন পড়া উচিত। বিশেষত সংসারি পুরুষের, জীবনসঙ্গীর সঙ্গে কীভাবে ব্যবহার করা উচিত। পুরুষের অসম্মানকে নারী শিক্ষা ভেবে নিয়ে নিজের জগৎ তৈরি করে নিতে পারে। লন্ডনে যখন বিবাহ বিচ্ছেদের পর নবনীতা হতাশার মধ্যে চলে গিয়েছিলেন। সেই অন্ধকার থেকে ফিরতে ভীষণভাবে আঁকড়ে ধরেন রবীন্দ্রনাথকে। তাঁর গানেই খুঁজে নেন মুক্তির ঠিকানা। শেষদিন পর্যন্ত নিজের আশপাশ থেকে সেই মুক্তির বলয়কে মুছতে দেননি। দুই মেয়েকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সবাইকে নিজের মতো করে আপন করে নিয়েছেন। তাঁর বাড়িতে পাঠকের জন্য সবসময় খোলা ছিল। রাধারাণীদেবী যে টেবিলে একসময় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে খেতে দিয়েছেন। মেয়ে নবনীতা সেই টেবিলেই আমাকে তাঁর জন্মদিনের কেক পায়েস দিয়ে আপ্যায়ণ করেছেন। ভাই অতনুদেবের তুলিতে চিত্রিত হয়েছেন নবনীতা, নিজে হাতে করে সেই ছবি তাঁকে দিয়ে এসেছি। সেই সময় ফের বাড়িতে যেতে বলেছিলেন, তা আর হল না। তবে অসুস্থতার খবর পেয়ে ফোন করতেই বলেছিলেন, “এতদিন কোথায় ছিলে? রোগ তো শরীরের হয়েছে, আমি আনন্দে আছি।” সেদিনই বুঝেছিলাম নশ্বর শরীরে বেঁধে থাকার মানুষ নবনীতা নন।

“ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিন্

নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ।

অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো

ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে।।”

 

Post Author: bongmag

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।