Basanta Utsab

দোল এলেই ভয় হয়, উন্মত্ত জনতার ভিড়ে একলাটি শান্তিনিকেতন

এবং রূপকথা

দোল আসছে, এসবিআই-এর পিছনের মাঠে থোকা থোকা পলাশ। বিদ্যাভবনের পুরনো অফিসে যেতে যে রাধাচূড়া পথ আটকে দাঁড়ায় সে এখন হলুদ শাড়িতে উচ্ছল তরুণী। হাতি পুকুরে ধারেও তারের ফাঁকে পলাশকে দেখলাম। কেমন লাজুক মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। দেখে একই সঙ্গে আনন্দ ও বেদনায় মনটা ভরে উঠল। উত্তুরে হাওয়া সবে পথ ভুলেছে, সন্ধ্যা হলেই বোলপুরে এখন দখিন হাওয়ার পাগলামি।  দোল আসতে তো আর বাকি নেই, গতবারের বসন্ত উৎসবের বেদনাদায়ক স্মৃতি এখনও টাটকা। আভাবনীয় ভিড়ের চাপে সেদিনের শান্তিনিকেতনকে দেখে মনে হচ্ছিল মেলার মাঝে ভরসার হাতটা ছিটকে গিয়েছে। দুচোখে ভয় আর অসহায়তা নিয়ে প্রিয়জনকে খুঁজে ফিরছে সে। বিশ্বভারতীতে এখন বসন্ত উৎসব হয় ঠিকই, তবে শান্তিনিকেতনের আত্মা তখন চুরি যায়।

আসলে উন্মত্ত ভিড়ে প্রিয়জনকে হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা তার মতো করে আর কেই বা বুঝবে। প্রতি বসন্তে তো তাকে দেখতেই সকলে আসে। তবে সেই সুর কেন তাল লয়ে মিশে গিয়ে গান হয়ে ওঠে না?  এমন বেসুরো ভিড় কি কবির বসন্তকে আবাহন করতে আসে না? তাই যদি আসতো তবে সাধের খোয়াইতে এত বাজার কীসের? সোনাঝুরির গায়ে শুধু প্রেমের নগ্ন প্রকাশ। সাঁওতাল পল্লির সারল্য চুরি করে সেখানে পাটিগণিতের হিসেব কষা চলছে। সাইকেলের দেখা পাওয়া ভার, চারদিকে শুধু নামিদামী চারচাকার ভিড়। লাল ধুলোয় চোখ খোলা দায়। অর্থের ঔদ্ধত্বে চাপা পড়েছে কিশোর রবির খোয়াই। এত ধুলো যে এক জীবনেও সেসব সরিয়ে সোনাঝুরির সৌন্দর্যকে ফিরিয়ে আনা যাবে না। আশ্রম মাঠ, ঘণ্টাতলা, সিংহসদন, গৌড়প্রাঙ্গন, আম্রকুঞ্জ, শালবীথি, কলাভবন, সংগীত ভবন, সবেরই বিধ্বস্ত চেহারা। কি ভাগ্যি মৃণালিনী আনন্দ পাঠাশালার প্রাঙ্গনে তারের বেড়া আছে। নাহলে শিশুর পদস্পর্শে রাঙা উঠোনের লালিত্য সেলফি জোনে হারিয়ে যেত।



গতবার বোলপুরও ভিড়ের চাপে অসুস্থ হয়েছিল। পদপিষ্ট হওয়াটা ছিল সময়ের অপেক্ষা। মার্চ মাসের কড়া রোদ্দুরে সে এক ভয়ঙ্কর অবস্থা। বিশ্বভারতীর পড়ুয়ারাও আশ্রম মাঠ থেকে বেরিয়ে শান্তিতে বাড়ি ফিরতে পারেননি। আর বাইরে থেকে যাঁরা প্রথমবার গুরুদেবের বসন্ত উৎসব দেখতে এসেছিলেন, তাঁরাও নিরাশ হয়েছেন। ভয়ঙ্কর স্মৃতি নিয়ে ফিরতে হয়েছে। এসব দেখে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, এবার আর নয়। বিশৃঙ্খলা এড়াতে দোলের আগেই বসন্ত উৎসব উদযাপন হয়ে যাবে গুরুদেবের শান্তিনিকেতনে। এই খবর প্রকাশ্যে আসার পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। প্রাক্তনীদের অনেকেই সহমত পোষণ করলেও বাইরের লোকজনের তরফে বিষয়টি সমালোচিত হয়েছে। ফেব্রুয়ারির ১৯ তারিখে নির্ধারিত দোল উৎসবের ঘোষণাও একপ্রকার হয়ে গিয়েছিল। তবে সকলে সহমত না হওয়ায় দোলের দিনেই বসন্ত উৎসবের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ।



ভিড়ের কারণে বদলে যাচ্ছে স্থান। এবার আশ্রম মাঠের বদলে মেলার মাঠে হবে বসন্ত উৎসব। এমন ঘটনা ২০১৩-তে ঘটেছিল। সেবারও মেলার মাঠে বসন্ত উৎসবের আয়োজন করে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ। সেখানেও কিন্তু বিশৃঙ্খলা কমকিছু হয়নি। প্রভাতফেরির পর ভিড় ঠেলে পড়ুয়াদের আশ্রমে ফিরতে বেশ কষ্ট করতে হয়েছে। সেবারও পাঁচিল টপকে অনেকেই আম্রকুঞ্জে ঢুকে পড়েছিল। এবার যে তেমনকিছু হবে না তা হলফ করে কেউ বলতে রাজি নন। আরও পড়ুন-ফেলে আসা মেয়েবেলা ও মন কেমনের বসন্ত উৎসব

প্রাক্তনীদের আশঙ্কা, দোল এলে এখন আর আনন্দ হয় না। বুকের মধ্যে ঢিপ ঢিপ করতে থাকে। ফুলে ফুলে রঙীন হয়ে ওঠা শান্তিনিকেতন বসন্ত উৎসবের পরের দিন  জঞ্জালের স্তূপে পরিণত হয়। সাধের পলাশ শতপায়ের চাপে লালধুলোয় মেখে এদিক সেদিক গড়াগড়ি খায়। শোনা যায়, উপাচার্যের পায়ে আবীর ছোঁয়ানোর আগেই উন্মত্ত ভিড় থেকে মুঠো মুঠো আবীর উড়ে আসতে থাকে। একমাত্র প্রথা মেনে আবীর খেলে বিশ্বভারতীর পড়ুয়ারা। আর যাঁরা বাইরে থেকে তা দেখতে আসেন, তাঁদের বেশিরভাগই দর্শক নন, বলা ভাল আপদ বিশেষ। বিশ্বভারতীর শিষ্টাচার মানেন না।  শান্তিনিকেতনের বিভিন্ন জায়গায় সাইনবোর্ডে জ্বলজ্বল করছে, “পদচিহ্ন ছাড়া কিছুই ফেলিয়া যাবেন না।” তারপরেও খাবারের ঠোঙা, আইসক্রিমের বাটি, চায়ের কাপ, আবীরের খালি প্যাকেট, খবরের কাগজ, ছিন্ন পলাশ লালমাটিতে গড়াগড়ি খায়।



বাঙালি যে দিনে দিনে সংস্কৃতিগতভাবে, দীন হয়ে পড়ছে তা আবীর ধ্বস্ত শান্তিনিকেতনকে দেখলে বেশ বোঝা যায়। গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যকে হেলায় ফেলে কীভাবে অপসংস্কৃতি বাঙালির রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে, তার বিবরণ স্বচক্ষে দেখতে হলে দোলের দিন দুয়েক পরে শান্তিনিকেতনে পা রাখুন। মনে হবে নির্মল প্রকৃতি যেন দানবীয় অত্যাচার সহ্য করে কাহিল হয়ে পড়েছে। ফের একটু একটু করে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে। একটা বছর ধরে ফুলে ফলে গন্ধে বর্ণে শান্তিনিকেতন যখন নিজেকে ভরিয়ে তোলে গৃহবাসীর দ্বারে দোলের খবর পৌঁছায়। ঠিক তখনই এই নামগোত্রহীন উদ্দামতার অত্যাচার অপাপবিদ্ধ শান্তিনিকেতনকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে যায়।

এই উদ্দামতার নাম যদি আধুনিকতা হয় তবে বাঙালি সত্যিই মরেছে। ভাষার মাধুর্য তো অনেক আগেই ভুলতে বসেছে। একমাত্র বৈতরণী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সেখানেও ফাঁকির কারবার। তিনি তো তারুণ্যকে নিত্য লালন করেছেন। নতুনকে স্বাগত জানাতে আয়োজনের ত্রুটি রাখেনননি। তবে বর্তমান কী করে তাঁর সৃজনীর ধ্বংসসাধন করে?  প্রকৃতির রং রূপ রস গন্ধকে রবিকবি কলমের ডগায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন। পরবর্তিতে তা সুরের মূর্চ্ছনায় বেজেছে। পায়ের ঘুঙুর হয়ে বোল তুলেছে। খেয়ালি তুলির রং বিলাসে কবির কাব্য যাপন সম্পূর্ণ হয়েছে। ঋতুভেদে বদলে যাওয়া শান্তিনিকেতন বসন্তে একেবারে অপ্সরা। কবির টানে লালমাটির পানে সেই অপ্সরাকে অনুভব করতে আজ আর কেউ শান্তিনিকেতনে আসেন না।

 

Post Author: bongmag

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।