khelapukur jagadhatri

চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী প্রতিমার কাঠামো পুজো হয় দুর্গা দশমীতে, পুজোর কয়েকদিনের অনুভূতি অসামান্য

শরৎকালের আকাশ দেখতে পেলে খুশিতে মনটা ভরে ওঠে না, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দুস্কর। শরৎ এল মানেই কাশের দোলায় মন ভুলিয়ে নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা ভাসিয়ে সে আসবে। আরে তাকে তো চেনোই, আমাদের দুগ্গা মা। বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে আশ্বিনের শারদ প্রাতে শোনার পর আর কাজকর্মে মন বসে না। মনে হয় সবকিছুতে তালা ঝুলিয়ে এখন শুধু মনের সুখে ঘুরে বেড়াই। ছেলেমেয়েকে সঙ্গে করে উমা এল বলে। কলকাতার দুর্গাপুজো তো বহুকাল হল মহোৎসবের আকার নিয়েছে। আর গঙ্গা পাড়ের একদা ফরাসী কলোনি চন্দননগরে? মা দুগ্গা সেই নগরে খুশির বার্তা বয়ে আনলেও আলোর বার্তার জন্য জগদ্ধাত্রীর পথ চেয়েই চন্দননগরের দিন কাটে। আরও পড়ুন-রবিবার বিকেল থেকে গোটা রাত চন্দননগর হয়ে যাক, রইল জগদ্ধাত্রী পুজোর রুট ম্যাপ

আজ আর মন ভোলানোর কিছু নেই, যিনি দুর্গা তিনিই তো রূপ বদলে জগদ্ধাত্রী হয়ে আলো ছড়াতে চলে আসেনি, একি তার ভক্তকুল বোঝে না। বোঝে সবই, তবুও শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের ভবতারিণী আরাধনার কথা কি মনে পড়ে না? এ-ও কতকটা তাই। সে যাকগে, চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজো সেখানকার বাসিন্দাদের কাছে অতি আনন্দের মুহূর্ত। পশ্চিমবঙ্গের বেশ কয়েকটি জায়গায় জগদ্ধাত্রী আরাধনা হয়, কিন্তু চন্দননগর যেন বিশেষত্বের বিচারে অনেকটাই এগিয়ে আছে। চন্দননগরের বাসিন্দা হিসেবে সিদ্ধার্থ শেঠ সেই অনুভূতির মুহূর্তগুলোকে Bongmag.com এর সঙ্গে শেয়ার করলেন

মা দুর্গাকে নিয়ে আবেগাপ্লুত চন্দননগরও তবে বিজয়া দশমীতে শুধু মন খারাপ বাসা বাঁধে না, জগদ্ধাত্রী পুজোর আগমনের দিন গোনাও শুরু হয়ে যায়। এমনিতেই সারা বছর ধরে আলো কেমন হবে, তানিয়ে চলতে থাকে সুস্থ প্রতিযোগিতা। প্রতিমা সবসময়ই সাবেকি, মণ্ডপে হয়তো কোনও কোনও বারোয়ারি ভিন্ন থিম করতেই পারে, তবে প্রতিমাতে সেসব চলবে না। আলোর কারিকুরিতেই সমস্ত নজর কেড়ে নেয়। ষষ্ঠী থেকেই জমতে থাকে ভিড়, আমরা ষষ্ঠীর রাতটিকেই ঠাকুর দেখার জন্য বেছে নিই। সমস্ত বরোয়ারি গুলো দেখে ফেলি গোটা রাত জুড়ে। এবার ষষ্ঠী শনিবার পড়েছিল। এই দিনটি কর্মক্ষেত্রে অনেকের ছুটি থাকলেও বাকিদের অফিস যেতেই হয়। তবে পরের দিন রবিবার হওয়ায় রাতে ঠাকুর দেখার আনন্দটা আলাদা। আরও পড়ুন-‘আলো নিয়ে চন্দননগর আজ যা ভাবছে, গোটা দেশ তা ভাববে আগামী বছর’

সারারাত ঠাকুর দেখে বেলা পর্যন্ত বিশ্রাম নাও। তারপর পাড়ার পুজোয় সময় দাও। মজার বিষয় হল, দুর্গা দশমীর দিন জগদ্ধাত্রীর কাঠামো পুজো শুরু হয়ে যায়। কুমোরটুলি নয়, বারোয়ারির প্রাঙ্গনেই চলে প্রতিমা তৈরির কাজ। প্রতিদিন একটু একটু করে রূপ পেতে থাকে মা জগদ্ধাত্রী। কোজাগরী পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় দেখা যায় প্রতিমা অঙ্গ গঠন প্রায় হয়ে এসেছে। কালীপুজোর সময় চলে রং করার পালা। তারপর চক্ষুদান, শাড়ি গয়না পরানো। বারোয়ারি হলেও চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোয়া প্রতিমাকে কম বেশি সোনার গয়না পড়ানো হয়। চন্দননগর বাসীর কাছে মা জগদ্ধাত্রীর গুরুত্ব অনেক, রীতিমতো মানত করা হয়। অসুস্থ সদস্য সুস্থ হয়ে গেলে পরিবারের তরফে মায়ের টিপ, নাকছাবি, বালা, মুকুট, হার কিছু একটা গড়িয়ে দেওয়ার চল রয়েছে। এছাড়া স্পনসররা তো আছেই। আরও পড়ুন- দেবী মূর্তিকে স্বপ্নে দেখে জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু করেন মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র, কেন জানেন?

এবার যেমন সেনকো গোল্ডের গয়নায় সেজেছে হেলা পুকুরের জগদ্ধাত্রী। এবার ৫০ বছরে পড়ল এই পুজো, তাই প্রতিমার পাশাপাশি আলোক সজ্জাতেও রয়েছে বিবিধ চমক। এবার নজর কেড়েছে মানকুণ্ডু স্পোর্টিং ক্লাব, নতুন পাড়া, নিয়োগী বাগান, বালক সংঘ, সার্কাস মাঠ, চারা বাগানের পুজো, গোপালবাগ, তেমাথার বিশাল প্রতিমা| এবার স্ট্র্যান্ড রোডের দিকে সোজা এসে দৈবকপাড়া, নোনাটোলা, বড়বাজারের প্রতিমা দারুণ হয়েছে। তবে টুনির জায়গায় এখন এলইডির ঝলক, তাই শৈশবের সঙ্গে এখনকার আলোর পার্থক্যটা সবথেকে বেশি চোখে ধরা পড়ে। পুজোর কয়েকটা দিন চন্দননগরে জনজোয়ার নামে। তবে পুজোর সেন্ট্রাল কমিটি থেকে শুরু করে স্থানীয়দের সহযোগিতায় এই ভিড়ে কোনও সমস্যা হয় না। রাতভর চন্দননগরে ঠাকুর দেখুন, কোনও সমস্যা নেই। আরও পড়ুন- রবিবার বিকেল থেকে গোটা রাত চন্দননগর হয়ে যাক, রইল জগদ্ধাত্রী পুজোর রুট ম্যাপ। আরও পড়ুন-ইতিহাসের মুহূর্ত ছুঁয়ে জগদ্ধাত্রী পুজোয় চন্দননগরের ইতিকথা



শোভাযাত্রার প্রসঙ্গ তো আলাদা করে বলতেই হবে। প্রতিমা নিরঞ্জনের আগে প্রায় ১২ ঘণ্টা ধরে চলে শোভাযাত্রা। যদি এই কদিনের মধ্যে চন্দননগরে এসে ঠাকুর দেখতে না পারেন তবে শোভাযাত্রার দিন আসতেই পারেন। ওই দিন বিকেল থেকে শোভাযাত্রার পথের দুপাশে চলে চেয়ার বিক্রির বিরাট কর্মকাণ্ড। একটা চেয়ার কিনে বসে পড়ুন। সন্ধে নামলেই আপনার চোখের সামনে থেকে একে একে ঠাকুর যাবে। বাহন হিসেবে থাকা লরিগুলির সাজও চোখে পড়ার মতো। বেশ কয়েকবছর হল, হেলা পুকুরের টাকুর আবার ট্রলিতে চেপে যাচ্ছে। বাগ বাজারের ঠাকুর এলে বুঝতেই পারবেন। ট্রাকের সামনে বড়ো বেলুন ওড়ানো হয়। আলোর সাজে ট্রাক চলেছে, উপরে সুসজ্জিত জগদ্ধাত্রী। এযেন কাকে ছেড়ে কাকে দেখি অবস্থা। হলফ করে বলতে পারি, এই সময় একবার চন্দননগরে এলে জীবনে ভুলবেন না।

ছবি সৌজন্য: গৌরব সিংহ, হুগলি
প্রতিমা : হেলা পুকুর, চন্দননগর

 

Post Author: bongmag

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।