Krishnanagar jagadhatri

দেবী মূর্তিকে স্বপ্নে দেখে জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু করেন মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র, কেন জানেন?

জগদ্ধাত্রী শব্দের আভিধানিক অর্থ জগৎ+ধাত্রী অর্থে জগতের ধাত্রী। ব্যপ্ত অর্থে দূর্গা, কালী-সহ অন্যান্য শক্তির দেবীও জগদ্ধাত্রী। তবে জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রচলন তুলনামূলক আধুনিককালে ঘটে| অষ্টাদশ শতকে নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় তাঁর রাজধানী কৃষ্ণনগরে এই পূজার প্রচলন করার পর এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়| যদিও দেবী জগদ্ধাত্রী যে বাঙালি সমাজে একান্ত অপরিচিত ছিলেন না, তার প্রমাণ পাওয়া যায়| শূলপাণি খ্রিষ্টীয় পঞ্চদশ শতকে ‘কাল বিবেক’ গ্রন্থে কার্তিক মাসে জগদ্ধাত্রী পুজোর উল্লেখ করেন| পূর্ববঙ্গের বরিশালে খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে নির্মিত জগদ্ধাত্রীর একটি প্রস্তর মূর্তি পাওয়া যায়| বর্তমানে এই মূর্তিটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ সংগ্রহশালার প্রত্ন বিভাগের রক্ষিত| রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজত্বকালের আগে নির্মিত নদীয়ার শান্তিপুরের জলেশ্বর শিব মন্দির ও কোতোয়ালি থানার শিব মন্দিরের ভাস্কর্য জগদ্ধাত্রীর মূর্তি লক্ষিত হয়| তবে বাংলার জনসমাজে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আগে জগদ্ধাত্রী পুজো বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়নি। কেবল কিছু ব্রাহ্মণের গৃহে দুর্গাপুজোর পাশাপাশি দেবী জগদ্ধাত্রীর আরাধনা হতো|আরও পড়ুন-রবিবার বিকেল থেকে গোটা রাত চন্দননগর হয়ে যাক, রইল জগদ্ধাত্রী পুজোর রুট ম্যাপ

কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর সূচনাই করেছিলেন মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়। কিংবদন্তি অনুসারে নবাব আলিবর্দির রাজত্বকালে রাজার কাছ থেকে ১২ লক্ষ টাকা নজরানা দাবি করেন| নজরানা দিতে অপারগ হলে তিনি রাজাকে বন্দি করে মুর্শিদাবাদে নিয়ে যান। মুক্তির পর নদীপথে কৃষ্ণনগরে প্রত্যাবর্তনের ঘাটে বিজয়া দশমীর বিসর্জনের বাজনা শুনে রাজা বুঝতে পারেন সেবছর দুর্গাপুজোর কাল উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছে। পুজোর আয়োজন করতে না পেরে রাজা অত্যন্ত দুঃখিত হন, সেই রাতে জলস্পর্শ না করেই শুয়ে পড়েছিলেন তিনি। সেই রাতেই রাজা স্বপ্নে দেখলেন এক অপরূপ সুন্দরী কিশোরী মূর্তি উদয় হয়েই মিলিয়ে গেল। তার জায়গায় দেখা দিল রক্তম্বুজা সিংহবাহিনী চতুর্ভুজা দেবীমূর্তি। দেবীমূর্তি রাজাকে বললেন, কার্তিক মাসের শুক্লা নবমীতে অর্থাৎ ঠিক একমাস পরে কুমারী রূপে তিনি আবার আসবেন রাজার কাছে। সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, এই তিনদিন তাঁর পুজো করার আদেশ দেন রাজাকে। এই সময়েই কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে জগদ্ধাত্রী পুজোর সূচনা হয় সালটা ১৭৬৬সাল। কেউ কেউ আবার মনে করেন কৃষ্ণচন্দ্রের প্রপৌত্র গিরিশচন্দ্র কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির জগদ্ধাত্রী পূজার প্রবর্তক। পুজোর দিনে কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির প্রবেশদ্বার সবসময় খোলা থাকে|



এদিকে ১৭৭২ সালে রাজবাড়ির দেখাদেখি কৃষ্ণনগরের চাষাপাড়ায় রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রজারা জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু করেন| এটি এখন বুড়িমার পুজো নামেই পরিচিত। এই বুড়িমার পুজো শুরু হয়েছিল  ঘটে ও পটে। প্রথম দিকে স্থানীয় গোয়ালারা দুধ বিক্রির টাকায় এই পুজোর আয়োজন করতেন| ১৭৯০ সাল নাগাদ গোবিন্দ ঘোষ ঘট পটের পরিবর্তে মৃন্ময়ী মূর্তি গড়ে জগদ্ধাত্রী পুজোর সূচনা করেন| এখনকার প্রতিমার বৈশিষ্ট্য হল, প্রায় ৭৫০ ভরি সোনার গয়নায় দেবী প্রতিমার অলংকার সজ্জা। কৃষ্ণনগরের বাসিন্দাদের মধ্যে এই দেবী অত্যন্ত জাগ্রত, তাঁর কাছে সব মনস্কামনা পূর্ণ হয়| এছাড়াও বর্তমানে কৃষ্ণনগরে বারোয়ারি জগদ্ধাত্রী পুজো হয় অনেক। আরও পড়ুন-ইতিহাসের মুহূর্ত ছুঁয়ে জগদ্ধাত্রী পুজোয় চন্দননগরের ইতিকথা



জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রকৃত নিয়ম হল একদিনেই হবে, দিনটি নবমী তিথি| একদিনে না পারলে তিন দিন ধরে হয় পুজো| বর্তমানে দীর্ঘ সময় ধরে আনন্দের জোয়ারে গা ভাসাতেই উৎসবপ্রিয় বাঙালি এটিকে তিন দিনের পুজো করে নিয়েছে| চৈতন্য সমসাময়িক স্মার্তপণ্ডিত রঘুনন্দন তাঁর ‘দুর্গোৎসতত্তম’ গ্রন্থে বলেছেন শুক্লা কার্তিকী নবমী তিথিতে প্রাতে সাত্ত্বিকী, মধ্যাহ্নে রাজসিকী ও অপরাহ্নে তামসিকী এই ত্রিকালীন পুজোই জগদ্ধাত্রী পুজো| পুজোয় বসতে হবে অরুণোদয় কালে| একই আসনে বসে সূর্যাস্তের আগে পর্যন্ত দফায় দফায় এবং নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে পুজো করে যেতে হবে| পুজো করতে হবে তিন বার তিন কালের| কারণ, জগদ্ধাত্রী পুজো ত্রৈকালীন পুজো| তবে শুধু কৃষ্ণনগর কিংবা চন্দননগরই নয়, কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন জায়গাতেও এখন মহা ধুমধামে  জগদ্ধাত্রী পুজো পালিত হয়|

Post Author: bongmag

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।