‘আলো নিয়ে চন্দননগর আজ যা ভাবছে, গোটা দেশ তা ভাববে আগামী বছর’

রাত পোহালেই নবমী তিথি, ইতিমধ্যেই জগদ্ধাত্রীর আরাধনায় জমজমাট চন্দননগর। প্রতিমা থেকে মণ্ডপ সবেতেই কে কাকে ছাড়িয়ে যাবে তানিয়ে চলছে সুস্থ প্রতিযোগিতা। আর এর মাঝেই নিজেদের স্বকীয়তা প্রমাণে শৈল্পিক স্বাক্ষর রাখছেন চন্দননগরের আলোকশিল্পীরা। সারা বছর ধরে একটু একটু করে ভাবনাকে পুঞ্জীভূত করেন, আর পুজো এলেই তাইই আলোক মালায় ফুটিয়ে তোলেন। আগে টুনিতে হাতেকলমে কাজ করতে অনেক সময় যেত, খরচও হত প্রচুর। এখন এলইডি সেই খরচকে কমিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সেদিনের চ্যালেঞ্জটাই যেন কোথায় হারিয়ে গিয়েছে। চন্দননগরের প্রসিদ্ধ আলোশিল্পী সুজিত মাজী, Bongmag.com-এ একান্ত আলাপচারিতায় শোনালেন নিজের কথা। আরও পড়ুন-রবিবার বিকেল থেকে গোটা রাত চন্দননগর হয়ে যাক, রইল জগদ্ধাত্রী পুজোর রুট ম্যাপ




প্রায় ১২ বছর ধরে আলোর কাজ করছি, প্রথমদিকে আলোর কাজ ছিল অঙ্ক। আমরা শ্রীধর দাসের হাত ধরে কাজ শিখেছি। চন্দননগরের আলোর সম্রাট বলা হত তাঁকে, তিনি তো যাদুকর। এখন আর কাজ করেন না, কিন্তু যা শিখিয়ে গিয়েছেন তা অমূল্য। লন্ডনের টেমস নদীর সেতুকে আলোক মালায় সাজিয়েছেন তিনি। চন্দননগর স্টেশনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একের পর এক ট্রেনের যাতায়াত লক্ষ্য করতেন, তারপর সেবারের পুজোয় দেখলাম মণ্ডপের বাইরে আলোর কারিকুরিতে সেই ট্রেন। স্টেশনে ট্রেন এসে থামছে আবার চলছে। শ্রীধরবাবুর কাজ সেতো চন্দননগরের আলো শিল্পের স্বর্ণযুগ। পরে সেই হাল ধরতে এসেছেন বাবু পাল। তবে শ্রীধর দাস একজনই হয়। হাতেকলেম কাজ করেছি ২০০০ সালের দিকে তবে সেসব তো আর ছবি নেই। তখন এতো ছবির চল ছিল না। তাছাড়া চন্দননগরে ১৯৯৬-৯৭ সাল এই সময়টা ছিল স্বর্ণযুগ।  জ্বলন্ত মোমবাতি গলছে, সেই গলা মোম থেকে লেখা হচ্ছে খলিসানির পুজো। আলোয় ফুটছে পুজোর নাম, এ এক অনন্য সৃজন। এখন সেই আলোর কারিকুরি আর নেই, সবটাই টেকনোলজি নির্ভর হয়ে গিয়েছে। আরও পড়ুন-ইতিহাসের মুহূর্ত ছুঁয়ে জগদ্ধাত্রী পুজোয় চন্দননগরের ইতিকথা



আলোর থিম করতেন সতীনাথবাবু। তিনি ভীষণ আপডেটেড মানুষ ছিলেন। সারাবছর খেয়াল রাখতেন কী বড় ধরনের ঘটনা ঘটল। তার উপরে ভিত্তি করে তৈরি হত সে বছরের আলোকমালা। লন্ডনের যুবরাজ প্রিন্স চার্লসের প্রথমা স্ত্রী লেডি ডায়ানার পথদুর্ঘটনায় মৃত্যুকেও তিনে আলোক মালায় রূপ দিয়েছিলেন। আবার প্রভাসের বাহুবলী তাঁর সৃজনেই আলোয় ফুটে ওঠে। এনিয়ে সারা বছর পড়াশোনা করতেন, তাঁর হাতে আঁকা নকশা ছিল বিশ্বমানের। এখনকার ভূবনদা, বুবলা দা, অভিজিৎ, চন্দননগরের এই শিল্পীরা সকালে আঁকতে বসার আগে একবার হলেও সতীনাথবাবুর নাম  উচ্চারণ করে সেদিনের কাজ শুরু করেন। তিনি অন্য মানুষ, চন্দননগরের সম্পদ। এই সতীনাথবাবু, শ্রীধরবাবুকে মাথায় রেখে এখন তো নিজেও ভাবনা তৈরি করছি। মোগলির জঙ্গলবুককে আমি আলোক মালায় ধরেছি। যাদবপুরের রিজেন্ট পার্কের পুজোয় সেই থিম হিট হয়ে যায়। এরমধ্যে বলে নেওয়া ভাল, সতীনাথবাবু একবার গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গা। এই যাত্রাপথটি তৈরি করেন। গঙ্গার বিভিন্ন বাক হরিদ্বারে গঙ্গার এঁকেবেঁকে চলা। সবটাই আলোয় ফুটে ওঠে। চন্দননগরের আলোয় সাজে জানবাজারের রানি রাসমণির বাড়িও। আরও পড়ুন-দেবী মূর্তিকে স্বপ্নে দেখে জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু করেন মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র, কেন জানেন?



সুখের খবর এই যে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার চন্দননগরের কেএমডিএ পার্কে লাইট হাব তৈরি করছে। সেখানে চন্দননগরের আলোর কারিগররা তাঁদের সৃজন সাজাবেন। ৩০টি দোকান থাকবে সেই হাবে। অনেক শিল্পী টাকা পয়সার অভাবে দোকান করতে পারেন না, বাড়িতে কাজ করেন। তাঁদের জন্য এই হাব দারুণ কাজ দেবে, ব্যবসার সুযোগ পাবেন অনেকে। আমি নিজে ইলেকট্রনিক্স নিয়ে পড়েছি, কিন্তু সবাই তো পড়াশোনা করে আলোর কাজে আসতে পারেন না। পরিস্থিতি সেই সুযোগ সবাইকে দেয় না। কাজ করতে করতে সবাই দক্ষ হয়ে ওঠে। আমি এখন শুধু জগদ্ধাত্রী পুজোই নয়, সরকারি অনুষ্ঠানেও কাজ করছি। চলতি বছরে মহাত্মা গান্ধী ১৫০-তম জন্ম বার্ষিকী উপলক্ষে কলকাতা জিপিও সেজেছিল আলোর মালায় ওটি আমারই কাজ। এখন জগদ্ধাত্রী পুজোর কাজগুলি অনেক কমিয়ে দিয়েছি, তবে তানিয়ে ভাবনা চিন্তা করি না এমনটা নয়। ভাবনাকে স্কেচবন্দি করে রাখি। পরে শিল্পী ভূবনদাকে দিয়ে আঁকিয়ে নিই। আমি না হোক অন্য কেউ এই কাজ আলোতে ফুটিয়ে তুলবেন এই আশা রাখি। তেমনই কল্পবিজ্ঞানের সিনেমা অ্যাভেঞ্জার্স নিয়ে স্কেচ করে রেখেছি। এটিও একদিন আলোক মালায় ফুটবে।

নিজের কথা বলতে গেলে শুরুতেই রয়েছে ডুপ্লেক্স পট্টি। এই ডুপ্লেক্স পট্টির ৪৯ বছরে আলোর মালায় সাজিয়েছিলাম। পালপাড়ার শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছি। সেকাজ অনেক ব্যয়সাধ্য, সময় সাধ্য তো বটেই। শোভাযাত্রার আলোর দায়িত্ব নিলে একসঙ্গে অনেকগুলি পুজোর কাজ করা কিছুতেই সম্ভব নয়। নিজের কাজের প্রতি তো ভাললাগা থাকে, পালপাড়ার সেই শোভাযাত্রা যখন চলল তখন কেঁদে ফেলেছিলাম। এবার হেলাপুকুরে মায়ের গায়ে ৫০ কেজির গয়না, স্পনসর সেনকো গোল্ড। উদ্বোধনে এসেছিলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। এই পুজোর আলোর কাজ করেছি। আশাকরি মানুষের ভাল লাগবে। পূর্বসুরীদের মর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ রেখে, শত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও সেরাটুকু দিয়ে চন্দননগরের আলোক শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই।

 

 

Post Author: bongmag

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।