Santu Mukherjee

৬৯-এই পূর্ণচ্ছেদ! না ফেরার দেশে বাংলা ছবির ‘রাজা’

সন্ধ্যা হয়েছে সবে। গৃহস্থবাড়ি থেকে ভেসে আসছে শাঁখের আওয়াজ। রায়গিন্নির অনেক দিন পর এই অসময়ে চোখে জল এল। বেশ ছিল দিনগুলো। বাইরে অন্ধকার নামতেই সাত তাড়াতাড়ি রান্না সেরে নিয়ে টিভির সামনে চলে আসা। এখনকার মতো তো এতগুলো টিভি চ্যানেলের হুড়োহুড়ি ছিল না। তখন একমাত্র শিবরাত্রির সলতে ডিডি বাংলা। আর আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু জন্মভূমি ধারাবাহিক। আকর্ষণীয় চরিত্র অবশ্যই জমিদার রতিকান্ত চৌধুরি। সেই সময় সবে বড়পর্দা ছেড়ে ছোটপর্দায় প্রবেশ করছেন অভিনেতা সন্তু মুখোপাধ্যায়। আজ কত ধারাবাহিক, কত নাম, কিন্তু জন্মভূমি আর দ্বিতীয়টা হল না। রতিকান্ত থেকে গেলেন বাঙালি দর্শকের মনে।

২৪টা ঘণ্টা আগে, এখনও পর্যন্ত তাঁর নশ্বর শরীরটা এই পৃথিবীতেই ছিল। ভাবা যায়, তিনি নেই। বারবার সংসার সীমান্তে ছবির কথা মনে পড়ছে। একে একে ভিড় করছে, ‘রাজা’, ‘হারমোনিয়াম’, ‘আতঙ্ক’, ‘গণদেবতা’, ‘প্রতিমা’, ‘ভালবাসা ভালবাসা’। কোনটা ছেড়ে যে কোনটার কথা বলি। উত্তমকুমার পরবর্তী বাংলা সিনেমায় রঞ্জিত মল্লিক, শমিত ভঞ্জ, শুভেন্দুদের পাশাপাশি সন্তু মুখোপাধ্যায়ও একটা বড় নাম। ওই ভাসা ভাসা চোখ, ঢেউ খেলানো একমাথা চুল, আর সযন্তে ছাঁটা গোঁফ। বাংলা ছবিতে এই চেহারা নিয়েই মাত করে দিয়েছেন তিনি। নায়ক হিসেবে তাঁকে দর্শক কতটা মনে রাখবে তা বলতে পারব না, তবে চরিত্রাভিনেতা হিসেবে সন্তু মুখোপাধ্যায় অনবদ্য। আরও পড়ুন- স্মৃতিটুকু থাক…



‘সংসার সীমান্তে’ ছবি তাঁকে নতুন পরিচয় তৈরি করে দিল। সেই ছবি আজ আর চাইলেও দেখতে পাবেন, প্রিন্ট নষ্ট হয়ে গিয়েছে। হৃত্বিক ঘটকই ছিলেন ছবির পরিচালক। কিন্তু শেষপর্যন্ত ছবিটা করে যেতে পারেননি। তাই কাজটা সম্পূর্ণ করেন পরিচালক তরুণ মজুমদার। মাঝে মাঝে সন্তু মুখোপাধ্যায়কে এনিয়ে দুঃখ করতেও শোনা গিয়েছে। তখনকার দিনের পরিচালকদের পকেটে পয়সা থাকত না। তাই মুক্তি পাওয়ার পর সেই ছবির প্রিন্ট সংরক্ষণ করাটাই বিরাট খরচের হয়ে যেত। সেই খরচের ধাক্কাতেই খোয়া গিয়েছে ‘সংসার সীমান্তে’। বাবা থিয়েটারে অভিনয় করতেন। ছেলের মনেও ছিল অভিনয়ের খিদে। তাই উচ্চমাধ্যমিকের পর আর বইপত্র নিয়ে সময় কাটাননি। নাচ শিখতে শুরু করেন, গানও শিখতেন। গুহঠাকুরতা পরিবারের সঙ্গে সন্তু মুখোপাধ্যায়ের যে একটা অবিচ্ছেদ্য যোগাযোগ ছিল তা গড়ে উঠেছিল গানের সূত্রেই। সেখানেই গান শিখতে যেতেন তিনি। ‘পারাবত প্রিয়া’ ছবিতে তাপস পালের লিপে তাঁর গাওয়া রবীন্দ্র সংগীত দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল। তাইতো রুমা গুহঠাকুরতার জীবনাবসানে বড় আঘাত পেয়েছিলেন। সতীর্থদের মধ্যে সন্তু মুখোপাধ্যায়ই একমাত্র অভিনেতা যিনি পেশাদার নৃত্যশিল্পীর কাছে রীতিমতো তালিম নিয়েছেন। আরও পড়ুন- বিমান দুর্ঘটনাতেই নেতাজির মৃ্ত্যু হয়েছে, বিশ্বাস করতেন কৃষ্ণা বসু



নায়ক কম খলনায়ক হিসেবেই বাঙলা চলচ্চিত্রে নজর কেড়েছেন সন্তু।  ভিলেনের পার্ট করেও সেই সময়কার সব নায়িকার বিপরীতে চুটিয়ে অভিনয় করেছেন। মহুয়া থেকে শুরু করে শর্মিলা ঠাকুর, সুমিত্রা মুখার্জি, তনুশ্রী শংকর কে নেই সেই তালিকায়। থিয়েটারপাড়াও এক সময় কাঁপিয়ে বেরিয়েছেন। তবে ওই যে বললাম খলনায়ক হিসেবে সন্তু মুখোপাধ্যায়ের সাফল্য হিংসে করার মতো। বিশ্বরূপাতে ‘প্রজাপতি’  থিয়েটারে সুখেন গুন্ডার চরিত্রে অভিনয় করে দিকে দিকে সন্তুর নাম ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়াও ‘সিরাজদৌল্লা’র মীরজাফর চরিত্র করে অনেক প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি। আরও পড়ুন-এলগিন রোডের বসুবাড়িতে বিষন্নতার সুর, প্রয়াত কৃষ্ণা বসু



কাজ করতে করতেই চলে গেলেন। কর্কটরোগ শরীরটাকে ক্ষয় করছিল অবিরত। তার মধ্যেও ‘মোহর’ ধারাবাহিকে অভিনয় করছেন। তাঁর শেষ মুক্তি পাওয়া ছবি ‘সাঁঝবাতি’। সেখানে নায়ক দেবের বাবার চরিত্রে ছিলেন সন্তু মুখোপাধ্যায়। তার আগে ‘গোত্র’। মারণ রোগকে সঙ্গী করেও অভিনেতা হিসেবে নিজের জাত চেনাতে ভোলেননি তিনি। আপাত দৃষ্টিতে গম্ভীর চরিত্রে দেখা গলেও বাস্তব জীবনে হাসিখুশি আমুদে মানুষ ছিলেন সন্তু মুখোপাধ্যায়। তাইতো অনুরাগীদের কাছে বাবার সেই চেহারাটাই রাখলেন মেয়ে স্বস্তিকা, অজপা। কর্মমুখর মানুষটার নিস্পন্দ শরীর প্রদর্শিত হল না। রাতেই পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে গেলেন বাংলা ছবির ‘রাজা’।

 

Post Author: bongmag

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।