Durgapuja 2019

ঢাকের বাদ্যি ডাকের সাজ, উমা এল ঘরে…

ঢাকের বাদ্যি, ডাকের সাজ রাঙা পায়ে উমা আসে বাপের বাড়ি। দেখতে দেখতে পুজো এসে গেল। বাঙালির দুর্গাপুজো। বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়ার সময় সুহসিনীকে বার বার করে ক্ষেমন্তী বলেদিয়েছিলেন তাঁকে যেন ভোরবেলা ডেকে দেয়। টুপ করে গঙ্গাস্নানটা সেরে আসতে হবে, রাত পোহালেই যে মহালয়া, শুদ্ধবস্ত্রে দেবীপক্ষের আগমনি না শুনলে মন যে তাঁর ভরে না। সেই কবে দিনাজপুরের মামা বাড়িতে তাঁর মহালয়া শোনার পাঠ শুরু হয়েছিল তা আর ঠিকমতো মনে পড়ে না। বাপ মা মরা ক্ষেমন্তীকে মেয়ের মতোই মানুষ করেছিলেন মামা সুদেব সরকার। এলাকার সরকারবাবু বলে কথা, গাঁ ঘরে তাঁর দাপট দেখলে চোখ কপালে উঠত। সাত গাঁয়ের লোক মামাকে মানিগণ্যি করত। দেশ স্বাধীন হলে আর জমিদারি ছিল না, তবে তাতে ঠাঁটবাট তো কমেনি। হাতিশালে হাতি আর ঘোড়াশালে ঘোড়া না থাকলেও সেরেস্তা, খাজাঞ্চি, নায়েব, গোপালের মন্দির নিয়ে বেশ সুখেই দিন কাটত মামার। দাদারা বিলেত থেকে পাশ দিয়ে এসে ব্যবসার ভার নিতেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন সরকারবাবু। তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে, এই বয়সে আর জমি জিরেত দেখে বেড়াতে ইচ্ছে করে না, ঠাকুরের নামগান করতে করতেই পরপারে চলে যাওয়ার ভাবনা মাথা চাড়া দেয়।



বড় ছেলে বলদেব মস্ত ব্যবসায়ী, মেজো জন ওকালতি করেন, কলকাতায় তাঁর বিরাট পসার। ছোটজন বাবার হিসেবপত্তর দেখেন তিনিও বিলেত ফেরত। সংসারে অভাবের লেশমাত্র নেই, মামি সরলাসুন্দরীর ইচ্ছেয় সেই বার থেকেই বাড়িতে শুরু হল দুর্গাপুজো। প্রথমবার প্রতিমার জন্য বায়না করে আসা হল। ধুমধাম করে পুজো দেখতে সরকার বাড়িতে গোটা পাড়া ভেঙে পড়েছিল সেবার। কালের নিয়মে সেই পুজো আরও বড় হয়েছে। পরের বছর থেকে নির্দিষ্ট শিল্পী ঠাকুর দালানেই প্রতিমা বানাতেন, কুলপুরোহিত সারতেন পুজো। সারা বছর ধরে চলত আয়োজন। দেবী দুর্গার আশীর্বাদে সরকারবাড়ির নাম ডাক খ্যাতি প্রতিপত্তি আরও বাড়তে থাকে। কাজের চাপে কলকাতায় থাকতে শুরু করেন ছোটদাদাবাবু। তবে ফি বছর তিনি পুজোতে বাড়িতে আসতেনই। দিব্যি কাটছিল দিন, সেই পুজো দেখতে এসেই ২৪ পরগনার রায়বাবু ক্ষেমন্তীকে নাতবউ করার প্রস্তাব দেন। মামারও বয়স বেড়েছিল, কবে আছেন তার ঠিক নেই। তাই সেই প্রস্তাব ফেলতে পারেননি, তাবলে হুট বলতে বিয়েও দেননি। সমস্ত খোঁজখবরের পর একদিন সরকার বাড়িতে সানাই বাজল, ক্ষেমন্তী গেল শ্বশুরবাড়ি। সরলাসুন্দরীদেবী আঁচলে চোখ মুছে ক্ষেমন্তীকে বিদায় দিলেন, ঠাকুরঝির অকাল মৃত্যুর পর সে যে তাঁর মেয়েই হয়ে উঠেছিল।



এরপর কত শরৎকাল গেল, উমা প্রতিবার ছেলেমেয়েকে নিয়ে বাপের বাড়ি আসে। কিন্তু সংসার বাড়লে আর হুট বলতে মামার বাড়ি যাওয়াটা ক্ষেমন্তীর হয়ে উঠত না। নলিনি রায় মানুষটা বেশ ভালই ছিলেন। সরকারি চাকরি করতেন, শরীরে কোনও রাগবোধ ছিল না। সারাটা জীবন ছোট্টো ক্ষেমন্তী তাঁর কাছে বড়ই হল না। কিন্তু মা ষষ্ঠী কৃপা করেননি, ঘরে নতুন প্রাণ এল না। পরিজনরা এনিয়ে দুঃখ করলেও কোনও আক্ষেপের ছাপ রায়বাবুর মুখে দেখেননি ক্ষেমন্তী। শেষদিন পর্যন্ত ভালবাসায় বেঁধে রেখেছিলেন। কোনও অভাব ছিল না। স্বামী চোখ বুঝতেই গোটা বাড়িটাই অনাথ আশ্রমকে দিয়ে কাশীবাসী হয়েছেন।



তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে, অভাগী সুহাসিনী কোথা থেকে একদিন তাঁর দোরে এসে পড়ল। নিজের কাছেই রেখেছেন। মেয়েটি ভারী ভাল, গতবার জ্বরে তো প্রায় মরতে বসেছিলেন, এই ছুঁড়ির যত্নেই তো চোখ মেলেন। বড় মায়া পড়ে গিয়েছে মেয়েটার উপর। কদিন আর বাঁচবেন, যা আছে এই মেয়েটিকেই দিয়ে যাবেন। পাশ ফিরতেই ঘরে কূপির আলো, সুহাসিনী ডাকছে ভোর যে হয়ে এল দিদা, নাইতে যাবে না? পাশের ঘরের রেডিওতে তখন সুপ্রীতি ঘোষ গাইছেন, বাজল তোমার আলোর বেনু……

Post Author: bongmag

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।