Irfan Khan

কবজিতে চোট নিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে অভিনয়, প্রতিশ্রুতি ও ভালবাসার নাম ইরফান খান

ইরফান খান, এই নামের সঙ্গে একরাশ দুঃখ যেন চিরকালের জন্য জড়িয়ে গেল। অভিনেতা ইরফান মানুষ হিসেবে যে কতটা খাঁটি ছিলেন, তা গত কয়েকদিনে সহকর্মী, বন্ধু, পরিচিত, পরিবার বা অনুরাগীরা সবাই বার বার করে বলেছেন। এই অসময়ে তাঁর চলে যাওয়াটা শুধু ভারতীয় সিনেমার জন্য বিরাট ক্ষতি, এমনটা নয়। বিদ্বেষের দুনিয়ায় যখন মানবিকতাকে দূরবিন দিয়ে খুঁজতে হচ্ছে তখন ইরফান খান একটা বিরাট ভরসার নাম। অনেকদিন পর ভারতীয়রা এক প্রিয়জনকে হারালো তাতে কোনও সন্দেহ নেই।



শুধুমাত্র প্রতিভাবান অভিনেতা হিসেবে নয়, একেবারে খাঁটি সোনার মতো হৃদয়ের অধিকারী তিনি। ইরফানের মৃত্যুর পর সপ্তাহ কাটলেও এখনও সেই বাস্তবকে মেনে নিতে পারেনি অনেকেই। প্রিয় অভিনেতাকে সবসময়ের জন্য সঙ্গে রাখতে এবার এলাকার নামের সঙ্গে ইরফানকে জুড়তে চলেছে মহারাষ্ট্রের গ্রাম। মহারাষ্ট্রের ইগতপুরি গ্রামে ইরফান খানের একটি বাগানবাড়ি রয়েছে। শুটিং, ছেলেদের পড়াশোনা থেকে ফুরসৎ মিললেই পরিবার নিয়ে সেখানেই চলে যেতেন অভিনেতা।

আদিবাসী অধ্যুষিত ইগতপুরিতে বেশ আনন্দেই কাটত দিনগুলি। প্রতিবেশীরাও এত বড় মাপের অভিনেতাকে দেখে কোনওদিনই অস্বস্তি অনুভবের সুযোগ পাননি। আসলে ইরফান সেই সুযোগ কখনও দেননি। একেবারে চিরচেনা মানুষের মতো সবার সঙ্গে মিশেছেন। সেখানে মূলত ত্রিঙ্গলওয়াড়ি, কুঁশেগাওয়ে, মেরাল, পরদেভি উপজাতিদের বসবাস। দারিদ্রসীমার নিচে থাকা এই আদিবাসীদের উন্নয়নের জন্য বাসিন্দা ইরফান খানের কাছে অ্যাম্বুল্যান্সের আবদার করেছিল স্থানীয় জেলা পরিষদ। মাস দুয়েকের মধ্যেই প্রতিবেশীদের চিকিৎসার সুবিধার্থে অ্যাম্বুল্যান্সের বন্দোবস্ত করে দেন তিনি।



স্থানীয় স্কুলের উন্নতিতে স্পনসর জোগাড় করা। হাজারেরও বেশি পড়ুয়াকে নিয়মিত বই খাতা, বর্ষাতি, জামাকাপড়, শীতের পোশাক দিয়ে সাহায্য করেছেন। পালা পার্বণে গ্রামের প্রতিটি পরিবারে ইরফানের তরফে মিষ্টি পৌঁছেছে। পিছিয়ে পড়া পড়ুয়াদের ডিজিটাল বিশ্বের সঙ্গে পরিচয়ের হাতেখড়ির ব্যবস্থাও করেছেন অভিনেতা। গ্রামের স্কুলে পৌঁছেছে কম্পিউটার। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে সেসব শিখছে ইগতপুরির আগামী প্রজন্ম।

যখনই প্রতিবেশীরা সাহায্যের জন্য ইরফানের কাছে গিয়েছেন, কখনও খালি হাতে তাঁদের ফেরাননি তিনি। সেই প্রিয় মানুষের মৃত্যুতে কেমন অনাথ হয়ে গেছে ইগতপুরি। তবে দুঃখের সঙ্গে নয়, আনন্দের সঙ্গে অভিনেতাকে মনে রাখতে সবাই, তাই ইগতপুরির যে এলাকায় ইরফানের বাড়ি সেখানকার নাম বদলে যাচ্ছে। ইরফানকে সবসময় নিজেদের সঙ্গে জড়িয়ে রাখতে ওই এলাকার নামকরণ হচ্ছে “হিরো চি ওয়াড়ি”_______  নায়কের পাড়া।



মহামারী করোনাভাইরাসকে কেন্দ্র করে ছবি তৈরির কথা ভেবেছিলেন ‘টুম্ববাদ’-এর পরিচালক আনন্দ গান্ধী। সেই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করবেন ইরফান খান। এমনটাও ভেবে নিয়েছিলেন পরিচালক। মহামারী নিয়ে বিগবাজেটের ছবি করতে চলেছেন আনন্দ গান্ধী। আগামী বছরেই শুরু ছবির শুটিং। লকডাউনের মধ্যেও চলছে চূড়ান্ত চিত্রনাট্য তৈরির কাজ। কলাকুশলীদের নির্বাচন। শুধু একটাই দুঃখ, ইরফান খানকে কাজে লাগানোর সুযোগ পাওয়া গেল না।

প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়াদের কী করে ফিরিয়ে আনতে হয়, তাদের ভিতরে অভিনয়ের স্ফুলিঙ্গ ভরে দিতে হয়, তা জানতেন ইরফান। তাইতো অভিনেত্রী টিসকা চোপড়ার হতাশা কাটাতে সচেষ্ট হয়েছিলেন তিনি। টিসকা অভিনয় ছেড়ে দেবেন একপ্রকার মনস্থ করেই ফেলেছিলেন, ইরফানের পরামর্শে সেই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নিজেকে ফিরিয়ে আনেন তিনি। নতুনভাবে অভিনয়কে বুঝতে শুরু করেন। ইরফানের প্রোডাকশনে টিভি শো-তে কাজও করেছেন টিসকা। একটা সময় জীবনের মোড় ঘোরাতে ইরফান তাঁকে দুটি ইংরেজি সিনেমার ডিভিডি দিয়েছিলেন। “বুলেটস ওভার ব্রডওয়ে”, “ওয়ান্স আপ  অন এ টাইম ইন আমেরিকা”। এই দুই সিনেমা-ই ওষুধের মতো কাজ করেছিল।



পরিচালক প্রিয়দর্শনের সঙ্গে একটা কমেডি ছবিতে অভিনয় করতে চেয়েছিলেন ইরফান খান। ‘বিল্লু’ ছবির শুটিং থেকেই দুজনের বন্ধুত্ব গাঢ় হয়ে ওঠে। কয়েক মাস আগেও কথা হয়েছিল। নবাব বাড়ির ছেলে ড্রামাটিক হবে, এমনটাই মনে হয়েছিল। বাস্তবের ইরফান সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের একজন মানুষ। সূক্ষতাই তাঁর অন্যতম সম্পদ। এখন থেকেই ইরফানকে মিস করতে শুরু করেছেন প্রিয়দর্শন।

ইরফান খানের হঠাৎ চলে যাওয়াতে ঠকে গিয়েছেন  বলে মনে করেন অস্কার মনোনয়ন পাওয়া পরিচালক অশ্বিন কুমার। ২০০৪ সালে ইরফানকে নিয়ে ছোট ছবি করেন অশ্বিন, সিনেমার নাম “রোড টু লাদাখ”। ইরফানকে কাছ থেকে দেখে পেশাদারিত্ব ও সিনেমার নতুন অর্থ বুঝতে শিখেছেন পরিচালক। লন্ডন ফিল্ম স্কুলের পড়া শেষ না করেই সিনেমা তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন অশ্বিন। সেসময় ইরফান খানের সহযোগিতা তাঁর ভাগ্য ফিরিয়ে আনে। অশ্বিন ইরফানের সঙ্গে কথা না বলেই তাঁর চরিত্র ঠিক করে ফেলেন। তারপর একদিন কথা পাড়েন। বিনা পারিশ্রমিকে অভিনয় করেছিলেন ইরফান। দিল্লি থেকে লাদাখের উদ্দেশে রওনা হওয়ার দিন সন্ধ্যায় কবজিতে চোট পেয়েছিলেন অভিনেতা, চাইলে শুটিংয়ে না করতে পারতেন। তবে নাম যখন ইরফান খান তখন কাজও তো ভিন্ন মাত্রারই হবে, তাই না।



হাতে ব্যথা নিয়েই লাদাখের মারকাটারি ঠান্ডায় প্রতিশ্রুতি রেখেছিলেন ইরফান খান। এমনকী ছবির অন্যান্যদের সঙ্গে শুটিংয়ের কটাদিন তাঁবুতেই কাটিয়েছিলেন রাত। সমসাময়িক অভিনেতাদের থেকে অনেক বেশি প্রতিভাবান হয়েও তাঁকে প্রতিষ্ঠা পেতে কম লড়াই করতে হয়নি। এই ক্ষণিকের যাত্রাতেই নিজের স্বাক্ষর রেখে গেলেন।

ইরফান অভিনীত শেষ ছবি “আংরেজি মিডিয়াম” দর্শকের প্রশংসা পেলেও ঠিকমতো বাণিজ্য করতে পারেনি। সৌজন্যে মহামারী কোভিডের থাবা। এদিকে দেখতে দেখতে পাঁচ বছর হয়ে গেল ইরফান দীপিকা অভিনীত “পিকু” ছবির বয়স।  “পিকু”-র সেটে ব্যাডমিন্টন খেলেছিলেন দুজনে। ছবির বর্ষপূর্তিতে দীপিকা প্রিয় অভিনেতাকে মনে করলেন সেই খেলার ভিডিও শেয়ার করে। যেখানে ইরফানের স্বচ্ছন্দ গতিবিধি চোখের কোণ ভিজিয়ে দেয়। লকডাউনে আরব সাগরের নীল জল ছুঁয়ে ঝকমক করছে বলিউড। শুধু ইরফান খান নেই, ভাবা যায়!

Post Author: bongmag

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।