Bangla Bhasa Utsab

সারারাত বাংলা ভাষা উৎসব, অ্যাকাডেমির উঠোনে রইল আমন্ত্রণ…

রাত পোহালেই একুশে ফেব্রুয়ারি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, বাঙালির আত্মার আত্মীয়। যে ভাষার জন্য একদিন দলে দলে জীবন বিলিয়ে দিতেও বাঙালি দু’বার ভাবেনি। সেই ভাষাদিবস ওপার বাংলার কাছে যেমন বিশেষ দ্রষ্টব্য, এপার বাংলায় তেমনটা আর হল কই। ভার্চুয়াল জগতেই এখন একুশে ফেব্রুয়ারির আসাযাওয়া নজরে আসে। তবুও নিজের মতো করে পশ্চিম বাংলাতেও এখন ভাষাদিবসের উদযাপন হয়। যেমন ইমানুল হকের ভাষা চেতনা সমিতি। ইমানুল টানা ২১ বছর ধরে কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে ভাষা দিবসের উদযাপন করে আসছেন, একেবারে অভিনব উপায়ে। সেই ১৯৯৯ সাল, দেখতে দেখতে ২১ পেরিয়ে বাইশে পা দিয়েছে। ভাষা চেতনা সমিতির বাংলা ভাষা উৎসব আজ টগবগে যুবক। এবারও ২০ তারিখ অর্থাৎ আজ থেকেই কলকাতার অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের সামনে রানুছায়া মঞ্চে শুরু হয়েছে উদযাপন।



সারারাত ব্যাপী একুশে ফেব্রুয়ারির উদযাপনে গান, কবিতা, নাটক, কী নেই তালিকায়। কলকাতার আকাশে বাতাসে নতুন করে বাংলা ভাষার মাধুর্য ছড়িয়ে দিতে ভাষা চেতনা সমিতির এই উদ্যোগ স্মৃতির শহরে ভিন্ন মাত্রা এনেছে। এদিন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার সাংস্কৃতিক সংগঠন রানুছায়া মঞ্চে অনুষ্ঠান করবে। এবার রানাঘাট থেকে নাটকের দল আসছে। চাইলে আপনিও একবার গিয়ে ঘুরে আসতে পারেন। মোহরকুঞ্জ ও অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের মধ্যবর্তী রাস্তায় আজ আলপনা আঁকা হবে। মাতৃভাষার জন্মদিন পালনে বাংলা মায়ের সন্তানরা আজ রাত জাগবে। ২১ বছর আগের শুরুটা আজও মনে পড়ে। সেদিন বাংলার সুশীল সমাজ ইমানুল হকের পাশে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৯৯-এর ২০ ফেব্রুয়ারি রবীন্দ্রসদন চত্বরে ভাষা চেতনা সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত ভাষাদিবসের অনুষ্ঠানে এসেছিলেন কবীর সুমন, নচিকেতা, স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্তরা। বিনা পারিশ্রমিকেই সেদিন গান গেয়েছিলেন তাঁরা। সেই সময় সঙ্গে ছিলেন পবিত্র সরকারের মতো মানুষ। আরও পড়ুন-স্মৃতিটুকু থাক…




তার আগের বছর ১৯৯৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বাংলাভাষা বাঁচানোর তাগিদেই ভাষা চেতনা সমিতি গড়ে ওঠে। সেদিন উদ্যোক্তা ইমানুল হককে সঙ্গ দিতে পাশে ছিলেন অশোক মিত্র, অন্নদাশংকর রায়, মৃণালিনী দাশগুপ্ত, অমিয় বাগচী, কুমার রায়, সুচিত্রা মিত্র, পরমেশ আচার্য, অশোক দাশগুপ্ত, অরুণ মিত্র, সন্দিপন চট্টপাধ্যায়, অমিতাভ চৌধুরির মতো ব্যক্তিত্ব। ঠিক হয়েছিল সারারাত ধরে একুশে ফেব্রুয়ারির উদযাপন হবে। দেখতে দেখতে ২২টা বসন্ত ছুঁয়ে ফেলল সেদিনের একুশ। তিন বছর রবীন্দ্রসদন, তারপর ভাষা চেতনা সমিতির এই উদযাপন চলে আসে অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের সামনে। একেবারে খোলা আকাশের নিচে। ক্ষিতি গোস্বামী মন্ত্রী থাকাকালীন ২০০৯ সালে সেখানেই তৈরি করে দিলেন রাণুছায়া মঞ্চ। যাকে আমরা ছাতিমতলা বলতেই ভালবাসি। সারা বছর সেখানে বিভিন্ন সংগঠন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে থাকে। আর বছর ঘুরে ২০ ফেব্রুয়ারি এলে ভাষা চেতনা সমিতির উদযাপন শুরু হয়ে যায়। আরও পড়ুন-ফেলে আসা মেয়েবেলা ও মন কেমনের বসন্ত উৎসব




ইমানুল হক বর্ধমানের ভূমিপুত্র। কলেজের পাঠ শেষ করে আজকালের সাংবাদিক হিসেবে কিছুদিন কাজ করেছিলেন। সেই সময় ৯১ সালে একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষাদিবসের উদযাপন দেখতে বাংলাদেশে যান। বলাবাহুল্য, তিনি খুশি হয়েছিলেন। আবার দুঃখও পেয়েছিলেন। কাঁটাতারের ওপারে বাংলা ভাষার জন্য এমন আয়োজন, আর এপারে তার ছিটেফোটাও নেই? অনু্প্রাণীত ইমানুল হক দেশে ফিরে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানেই প্রথম শুরু করেছিলেন একুশে ফেব্রুয়ারির উদযাপন। তারপর ছাত্রজীবনের পাট চুকোলে কলকাতায় চলে এলেন, গড়ে উঠল ভাষা চেতনা সমিতি। সেই সংগঠন আজ বাঙালির আত্মজন হয়ে উঠেছে। জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে আজ একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানে যাঁরা কলকাতায় আসেন তাঁদের অন্যতম গন্তব্য রাণুছায়া মঞ্চ। অসম ত্রিপুরা, থেকে শুধু নয়, বাংলাদেশ, সুইডেন, নরওয়ে, জার্মানি, ইংল্যান্ড থেকেও ভাষা চেতনা সমিতির একুশে উদযাপনে যোগ দিতে অতিথিরা এসেছেন এই রাণুছায়া মঞ্চে। আরও পড়ুন-মধ্যবিত্ত বাঙালির ভীরু প্রেমের নায়ক, জীবননাট্যের শেষ অংকে মহুয়ার দেশে তাপস পাল




২০১৩-তে খোলা আকাশের নিচে এখানেই হয়েছিল ১২টি ভারতীয় বাদ্যযন্ত্রের কনসার্ট। এমন কনসার্ট সাধারণত ইন্ডোরে হয়। উন্মুক্ত প্রাঙ্গন হিসেবে ভারতবর্ষে প্রথম এমন কনসার্ট হল রাণুছায়া মঞ্চে। বাংলা সংস্কৃতির বিচিত্র ভাণ্ডারের রস আপনাকে উপলব্ধি করতে হলে ভাষা চেতনা সমিতির একুশে উদযাপনে একবার আসতেই হবে। রবীন্দ্র সংগীত, নজরূল গীতি, গণসংগীত, শ্যামা সংগীত, আলকাপ, ফকিরি, মুর্শীদি, এমনকী চুরুলিয়ার দুর্লভ ঘোড়া নাচ, শহর কলকাতাকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে ভাষা চেতনা সমিতি। এখানেই পুরুলিয়ার ঝুমুর এসেছে, এসেছে রাইবেশে নৃত্য। রাইবেশে বাঙালির বীরত্বের নাচ, তাকে তো হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না। ২০১৬-তে এখানেই প্রথম ঠিক হয়, বাড়ির পুরনো পোশাক কেচে ইস্তিরি করে টাঙানো থাকবে। যার যেমন প্রয়োজন মনে হবে তিনি নিয়ে যাবেন। কে দিলেন আর কে নিলেন কেউ কাউকে চিনবেন না। এখন এমন উদ্যোগ ভাষা চেতনা সমিতির তরফে সারা বছর চলে। একুশে উদযাপনের হাত ধরে শুধু সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন নয়, বাঙালির নিজেকে চেনার সুযোগ করে দিয়েছে ভাষা চেতনা সমিতি। আসুন না আজ সারারাত না হোক আগামী একুশের দিনটা রাণুছায়া মঞ্চে যাই। বাংলার সংস্কৃতির বিপুল ভাণ্ডারের আস্বাদ নিই, ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখি মননে। বাকিটা বছর তাই হোক আমাদের অর্জন। আরও পড়ুন-মারণ টিউমার বাদ দিতে মাথায় চলেছে জটিল অস্ত্রোপচার, অপারেশন টেবিলে বেহালা বাজাচ্ছেন রোগিণী

 

Post Author: bongmag

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।