Darjeeling

ওল্ড সেমেট্রি ও দার্জিলিংয়ের ইতিকথা

অভিজিৎ মিত্র

দার্জিলিং বাঙালির আবেগ। তবে দার্জিলিং বলতে শুধু টাইগার হিল, বাতাসিয়া লুপ নয়। সকাল বিকেল গ্লেনারিজ, কেভেন্তাস, জোহি’জ পাব আর সেভেনপয়েন্ট সাইটসিনও নয়। তার বাইরেও আছে শহরের এক অন্য পরিচয়। পাহাড়ি পাইনবনে ভেসে বেড়ানো উড়ুক্কু কাঠবিড়ালির দার্জিলিং, মাকড়সার জালে স্ফটিক দানার মতো জমে থাকা শিশিরের দার্জিলিং, দাঁড়কাক উড়ে বেড়ানো হালকা শীতের কার্নিশের দার্জিলিং। জানালা খুলে দিলে মেঘ ঢুকে পড়া দার্জিলিং।

সবুজ পাহাড়ের কোল ঘেসে বাদামি ফিতের মতো পথ এঁকেবেকে চলে যাওয়া দার্জিলিং। ভাঙা চিমনির মাথা থেকে ধোঁয়ায় মিলিয়ে যাওয়া দার্জিলিং। কাঠের বারান্দায় বাহারি ফুলের দার্জিলিং। উজ্জ্বল মোরগের পাঁচিলের উপর লাফিয়ে বুক চিতিয়ে ডেকে উঠা দার্জিলিং। উলের গোলার মতো কুকুর ছানার ভৌ ভৌ ডেকে ছুটে বেড়ানো দার্জিলিং। আরও পড়ুন-পৃথিবী কবে সুস্থ হবে? এই বৈশাখে স্বপ্ন দেখি…



এরই মাঝে এবার অজানা একজনকে খুঁজতে যাওয়া, প্রিয় শহর দার্জিলিঙে। না পেয়ে, ব্যর্থ মনোরথে ফিরতে ফিরতে হিসেবের খাতা খুলে দেখলাম, না পাওয়ার থেকে পাওয়ার তালিকা অনেক বেশি। তেমন করে চাইলে কেউ আমাদের ফেরায় না। সাহেবরা বলতো হোমলি ওয়েদার। বড়লাট লর্ড লিটন ওঁর স্ত্রীকে চিঠিতে লিখেছিলেন-“…such beautiful English rain, such delicious English mud!”

কিন্তু দিনের পর দিন ঘন কুয়াশা, ঝিরঝিরে বৃষ্টি, স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ায় প্রিয়জনদের ছেড়ে কার একা থাকতে ভাল লাগে? এতো বর্তমানের দার্জিলিং নয়।ঘন জঙ্গল, হাজারও বন্যপশু, নানাবিধ রোগ, জলের সমস্যা, একাকীত্বের দার্জিলিং। ফলে সাহেবদের মধ্যেও অবসাদ বাড়তে থাকে। এমনই একজন ছিলেন ইটালিয় লুই মান্ডেলি। চংটং চা বাগানের প্ল্যান্টার ও পক্ষী বিশারদ। এখন ঘুমিয়ে আছেন দার্জিলিঙের ওল্ড সেমেট্রিতে। একসময় ওঁর সংগ্রহে ছিল হাজার হাজার পাখির দেহ। নিপুন হাতে একটিও পালক বিশ্রস্ত না করে পাখিগুলির দেহ থেকে প্রাণ নিভিয়ে দিতেন।



১৮৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের এক ধূসর বর্ষণমুখর অপরাহ্ণে আটচল্লিশ বছর বয়সে ট্যাক্সিডার্মির রাসায়নিকে নিজের জীবনের ইতি টানলেন। যদিও স্থানীয় বিশপের ডেথ রেজিস্টারে লেখা আছে- ‘মৃত্যুর কারণ অজ্ঞাত’। আত্মহত্যার উল্লেখ থাকলে ক্রিশ্চান ধর্ম মেনে সমাধিক্ষেত্রে ওঁর ঠাঁই হতো না। ওঁর রেখে যাওয়া চিঠিপত্রে ছড়িয়ে আছে পরিবার পরিজন থেকে দূরে নিঃসঙ্গতার করুণ বেদনা। আরও পড়ুন- বিমান দুর্ঘটনাতেই নেতাজির মৃ্ত্যু হয়েছে, বিশ্বাস করতেন কৃষ্ণা বসু

এক বন্ধুকে লিখছেন- “আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে একজন প্ল্যান্টারের জীবন কোনওমতেই সুখকর নয়। এই বছরের কথাই ধরো না- প্রথমে শুখা, তারপর অবিশ্রান্ত বৃষ্টি, তার উপর আবার কুলিলাইনে কলেরার মড়ক; এরই মধ্যে বাগানের পরিদর্শন তো আছেই। এইসব একসঙ্গে যোগ করলে যে কাউকে উন্মাদ করে দিতে পারে।”



বন্ধু বেড়াতে দার্জিলিং আসার ইচ্ছে প্রকাশ করলে বন্ধুকে লিখছেন-“তুমি এখানে এলে আমার খুব আনন্দ হবে। কিন্তু যেহেতু তুমি বর্ষাকালে আসতে চাইছো এবং স্বাস্থোদ্ধারের সঙ্গে পাখিচর্চা জুড়তে চাইছো, আমি বলব যে এসময় দার্জিলিং তোমার জন্য নয়। এখানে বর্ষা ভয়ঙ্কর, আর্দ্রতা মারাত্মক, কুয়াশা এতই ঘন যে কয়েক গজ দূরের কিছু দেখা যায় না। তাছাড়া এসময়ে সিকিম ভ্রমণ করতে যাওয়া নিছক পাগলামি হবে-জোঁকে তোমায় জ্যান্ত খেয়ে ফেলবে।”

চুয়াল্লিশ বছর বয়সে লিখছেন-“শরীর ভালো নেই। মনে হচ্ছে খুব তাড়াতাড়ি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি।…দু-তিন মাস হল ঘুসঘুসে কাশি, জ্বর,বধিরতা। মনে হচ্ছে জ্বরা আমার ভিতরে দ্রুত চারিয়ে যাচ্ছে।…” চিঠিপত্র ছাড়া আমাদের জন্য রেখে গেলেন কয়েক হাজার দুষ্প্রাপ্য পাখির দেহ ও ডিম। তার কিছু আছে দার্জিলিঙের ‘বেঙ্গল ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে’। বেশীরভাগই চলে গেছে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে ও ওঁর জন্মস্থান মিলানে। আরও পড়ুন-স্মৃতিটুকু থাক…

দার্জিলিং চকবাজার থেকে কার্ট রোড ধরে লেবঙের দিকে কিছুটা গেলে হ্যাপি ভ্যালি টি স্টেটের বিপরীতে রাস্তার ডানহাতে ওল্ড সেমেট্রি। একরাশ অভিমান অবজ্ঞা আগাছার জঙ্গল সেজে ঢেকে রেখেছে প্রাচীন ইতিহাস। বেশিরভাগ সমাধি ফলক পড়া যাচ্ছে না, যোগ চিহ্ন কেটে প্রেমিক-প্রেমিকা নাম লিখে গেছে, মার্বেলের ফলক ভেঙে ভিতরের অন্ধকার উঁকি দিচ্ছে, একটি সমাধির উপরে উঠে স্কুল ফেরত ছেলের দল মদ্যপান করছে। এমন দৃশ্যও চোখে পড়ল। অনেক খুঁজেও পেলাম না লুই মান্ডেলি’র সমাধি। হতাশ হয়ে যখন ফিরে যাব ভাবছি, দেখা হয়ে গেল পুষ্পা ছেত্রী’র সঙ্গে। কথায় কথায় জানতে পারলাম এখানে একশোর মতো সমাধি আছে। তারমধ্যে কেবল দুটি সমাধি ‘আরকিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া-র কলকাতা চ্যাপ্টার’ রক্ষণাবেক্ষণ করে। পুস্পা ছেত্রী সেই কাজে নিয়োজিত। যদিও পুরো সমাধিক্ষেত্রটি ‘ন্যাশনাল ইম্পর্টেন্স’ হিসেবে চিহ্নিত।



১৮৬৫ সালে সমাধিক্ষেত্রটি স্বীকৃতি পায়। যদিও এখানে ১৮৪০ সালের সমাধিও রয়েছে। সমাধিক্ষেত্রের উপরের অংশের সমাধিগুলি মূলত ১৮৪০-এর সময়কার। এই সমাধিক্ষেত্রেই কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে মুখ করে ঘুমিয়ে আছেন দার্জিলিঙের কলম্বাস জর্জ অ্যালিমার লয়েড। ১৮২৮ সালে সিকিমের রাজার সাথে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুই অফিসার জর্জ অ্যালিমার লয়েড ও জে ডব্লিউ গ্রান্ট চুক্তি করেন। ১ ফেব্রুয়ারি ১৮৩৫ সাল থেকে দার্জিলিং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অংশ হয়। চুক্তিপত্রটি লয়েড পেশ করেছিলেন লেপচা ভাষায়, যা সিকিমের রাজা বুঝতেন না। সিকিমের রাজার বোঝাপড়ায় ছিল যে এই চুক্তি মোতাবেক তিনি ক্ষতিপূরণ পাবেন, ১৮৪১ সালে বার্ষিক তিন হাজার টাকার শর্তে। ১৮৪৬ সাল থেকে যা বেড়ে ৬ হাজার টাকা হয়। কিন্তু তাও তিনি পাননি। আরও পড়ুন-ক্যানভাসে বৃষ্টির রাত, প্রহর জাগে ১৪ ফেব্রুয়ারি

পরে ব্রিটিশরা ওই অঞ্চলে রাস্তাঘাট বাড়িঘর তৈরি করতে শুরু করলে সিকিমের রাজা আরও জোড়ল প্রতিবাদ করলে ব্রিটিশরা ক্ষতিপূরণ বাবদ একটা দো-নলা বন্দুক, একটা রাইফেল, কুড়ি গজ লাল কাপড় এবং দুটো শাল সিকিমের রাজাকে পাঠিয়ে দেয়। অফিসার জর্জ অ্যালিমার লয়েড দার্জিলিংকে ভালোবেসে এখানেই থেকে যান। ১৮৬৫ সালে ৭৬ বছর বয়েসে লয়েড দার্জিলিংএ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।



লাসা যাবার পথে দার্জিলিঙেই ১৮৪২ সালে মৃত্যু হয় বিখ্যাত হাঙ্গেরিয়ান ভাষাতত্ত্ববিদ আলেকজান্ডার ক্রোমা দে করস-এর। যিনি তিব্বতীয় ভাষায় প্রথম অভিধান লেখেন। তিব্বতীয় ব্যাকরণে ওঁর অবদান অনস্বীকার্য। ১৮৩৭ থেকে ১৮৪২ সাল পর্যন্ত আলেকজান্ডার এশিয়াটিক সোসাইটি কলকাতা চ্যাপ্টারের লাইব্রেরিয়ান ছিলেন। এখনও প্রতিবছর হাঙ্গেরি থেকে সরকারি আধিকারিকরা ওঁকে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন।

অন্য একটি সমাধিতে একজন স্বামী ওঁর প্রিয় স্ত্রীর জন্য লিখেছেন- "To The Memory of REBECCA The Wife of T. BRACKEN ESQ. OB: 27th September 1844 ….." অন্য এক সমাধিতে লেখা- "Like the flower of the field which today is and tomorrow withered away. Blessed are the pure in heart as they shall see god"

একসময় এই সমাধিক্ষেত্রটি ম্যাল রোডের সেন্ট অ্যান্ডুস চার্চের অধীনে ছিল। ১৯৭০ সালে নথি রাখার জন্য এখানে উপর জরিপ করা হয়। ফটোগ্রাফির দায়িত্ব পায় দার্জিলিঙের বিখ্যাত দাস স্টুডিও। রহস্যজনক ভাবে সেই নথিপত্র গায়েব হয়ে যায়। নিরাপত্তাহীনতায় এই ভাবেই একের পর এক হারিয়ে যায় সমাধিক্ষেত্রের চারপাশের লোহার রেলিং, স্টিলের পাতের উপর খোদাই করা মানুষের ইতিহাস।



সন্ধে নেমে আসছে, সেমেট্রিকে ঘিরে ধরছে মায়াবী মেঘেদের দল। শিরশিরানি হাওয়ায় দুলছে পাইনবন। এবার ওঁরা জেগে উঠবেন। রাস্তার উল্টো দিকে আরও কিছু সমাধি খুঁজে পেলাম। অপঘাতে মৃত্যুর কারণে যাঁদের মূল সমাধিক্ষেত্রে ঠাঁই মেলেনি। ওঁদের রাখা হতো এখানে, সীমাহীন অবজ্ঞায়। রাত যত বাড়বে রাস্তার দুপাশের প্রতিবেশীদের কলতানে তত মুখরিত হবে বাতায়ন।

ইটালিয় লুই মান্ডেলিকে আমি খুঁজে পাইনি। পাশেই কোনও গাছের ডালে বসে বেটা খুব হাসছে নিশ্চয়। এরপর দার্জিলিং ম্যালে খচ্চরের পিঠে ভবিষ্যৎকে দুচক্কর খাইয়ে, অতীতের জন্য শাল-সোয়েটার কিনব। তারপর দার্জিলিঙে বাঙালি ভাতের হোটেল খুঁজতে খুঁজতে ভুলে যাব না হয় আমাদেরই যাবতীয় উপাখ্যান। কী হবে এত জেনে?

Post Author: bongmag

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।