Tribeni

Tribeni Jafar Khan Ghazi Mosque: ত্রিবেণী ও শতাব্দী প্রাচীন জাফর খাঁ গাজির মসজিদ

ত্রিবেণীর (Tribeni)  জীবন তরঙ্গ বড়ই বিচিত্র। কান পাতলে সেই সুখ দুঃখের অংশীদার আপনিও হতে পারেন। দিনভর তার জলে দার টেনে ভেসে বেড়ায় ডিঙি নৌকো, যাত্রী পারাপারের লঞ্চ। কখনও সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া ট্রলার তাকে ছুঁয়ে যায়। এক দুই করে দশক বদলে শতক পেরিয়ে যায়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একই ছন্দে বয়ে চলে পুণ্যতোয়া গঙ্গা। অবিভক্ত বাংলায় তখন ভাগীরথীর (Tribeni)  চলমানতা। এলাহাবাদের সঙ্গম ছেড়ে হুগলির অদূরে ত্রিবেণীতে (Tribeni) মুক্তবেণী হয়ে জুড়েছে ভাগীরথী, যমুনা ও সরস্বতী। এই যমুনার সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশ বা উত্তর ভারতের যমুনাকে মেলাতে যাবেন না। এটি ভাগীরথীর শাখানদী।

Tribeni Jafar Khan Ghazi Mosque: :ত্রিবেণীর তীরেই জাফর খাঁ গাজির দরগা

যেমন ছিল সরস্বতী। কালের গর্ভে সে এখন খালে পরিণত হয়েছে। তবুও ত্রিবেণীর (Tribeni)  তিরতিরে জলরেখায় কান পাতলে তার সমৃদ্ধির ইতিহাস শুনতে পাবেন। এক সময় কত লটবহর নিয়ে আসত জাহাজ। বিদেশী বণিকরা বাংলার তাঁতের কাপড় মশলার টানে সপ্তগ্রামের বন্দরে ভিড়ত। তুর্কি, পাঠান, মোগল, পর্তুগিজ, দিনেমার, ফরাসি, ওলন্দাজ, ইংরেজ। কতই না ওঠাপড়ার দেখেছে এই ভাগীরথী (Tribeni) । বাংলার রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ের পর এই শ্যামল প্রকৃতি আর প্রিয় ভাগীরথীকে ভালবেসে ফেলেছিলেন জাফর খাঁ গাজি।

তাইতো জয়লাভ করে দিল্লিতে আর ফিরলেন না। আস্তানা গড়ে তুললেন ত্রিবেণীর (Tribeni)  ধারেই। একুশ শতাব্দীর ত্রিবেণীর (Tribeni)  পারে গেলে দেখতে পাবেন ৭২৩ বছরের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে মসজিদ। চৌহ্দ্দিতে ঢুকে ডানদিকে নজরে পড়বে দরগা। যেখানে ঘুমিয়ে আছেন দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহর প্রবল পরাক্রান্ত সেনাপতি জাফর খাঁ গাজি (Zafar Khan Ghazi) এবং তাঁর পুত্ররা।

Tribeni
গাজি দরগা (Photo Credits: bongmag.com)

গাছপালার ফাঁকে ততক্ষণে ৬ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি আপনার নজরে এসেছে। ইট পাথরের মেলবন্ধনে এক অভিনব স্থাপত্য। পোড়ামাটির কাজ যেখানে মূল বৈশিষ্ট সেখানে পাথরের মসজিদ ৭২৩ বছর আগে কী করে গড়ে উঠল তা নিয়ে হাজারও জিজ্ঞাসা রয়েছে। কিন্তু উত্তর কোথায় মিলবে জানা নেই। কৌতহূল চেপে মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতেই বিষ্ময়। পশ্চিম দেওয়ালে মেহরাবের ধার ঘেঁষে এমন অনেক নকশা চোখে পড়বে যা বাংলার মন্দিরকে মনে করায়।

আরবি ফলকের আশপাশে দেওয়ালে শোভা পাচ্ছে বিষ্ণুমূর্তি, নৃত্যরত কৃষ্ণ, কোথাও বা ফুল বেলপাতা-সহ বিবিধ নকশা, এমনকী মঙ্গলঘটও। পশ্চিম দিকের ব্যাসল্টে আর্বি লিপি দেখে পিছনে ফিরতেই চোখ চলে যাবে দুই কুলুঙ্গিতে। যার একটিতে রয়েছে ঘড়ি। ইসলামিক শরিয়তে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘরিতে সেই ফজর, জোহর, আসর, মগরিব ও এশার নামাজের সময় বর্ণিত রয়েছে। যা ধর্মপ্রাণ মুসলিমের কাছে অবশ্য পালনীয়। আরও পড়ুন-Saptagram Port: অতীতের সপ্তগ্রাম ও সৈয়দ জামালুদ্দিন মসজিদ

পশ্চিম দেওয়ালের মাথায় ছাদের একাংশ টিকে আছে। ইতিহাস বলছে জাফর খাঁ গাজির এই মসজিদ ছিল ১০টি গম্বুজ বিশিষ্ট। কালের নিয়মে চারটি গম্বুজ অতিত হয়েছে। মসজিদের ভিতরে একের পর এক অলিন্দ মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের নিদর্শন। প্রবেশদ্বারের দিকে এগিয়ে এসে বাঁদিকে তাকালে দেখবেন টিনের দান বাক্স। আর গা ঘেষে দাঁড়িয়ে থাকা দেওয়ালে বাংলার টেরাকোটা শিল্প। লতা, পাতা মাঙ্গলিক চিহ্নে সে এক বিচিত্র শৈলি।

Tribeni Jafar Khan Ghazi Mosque: : ৭২৩ বছরের ইতিহাসের সাক্ষী জাফর খাঁ গাজির মসজিদ

৭২৩ বছর আগে জাফর খাঁ গাজির (Zafar Khan Ghazi Mosque)  তৈরি এই মসজিদই হল অবিভক্ত বঙ্গ দেশের প্রথম ইসলামিক স্থাপত্য। যুদ্ধ জয়ের পর স্মারক হিসেবে এই মসজিদ নির্মাণ করিয়েছিলেন জাফর খাঁ গাজি (Zafar Khan Ghazi Mosque) । কেউ কেউ বলেন মন্দির ভেঙে তৈরি হয়েছিল মসজিদ। তবে এর প্রামাণ্য কোনও তথ্য নেই। মনে করা হয়, পরিত্যক্ত কোনও মন্দিরের ভাঙা দেওয়ালের অংশ, টেরাকোটার কারুকাজ, দেবদেবীদের মূর্তি, শিল্পকর্ম জুড়েই মসজিদ নির্মাণ করান জাফর খাঁ গাজি। আরও পড়ুন-Hanseswari Temple: ইতিকথায় হংসেশ্বরী মন্দির ও রাজা নৃসিংহদেব

ইতিহাস বলছে, সুলতানি আমলে বাংলায় ছিল হিন্দু রাজাদের প্রতিপত্তি। ত্রিবেণীর (Tribeni)  এক মুসলিম প্রজার বাড়িতে অনুষ্ঠান উপলক্ষে গরু কুরবানি হয়েছিল। সেই খবর পেয়ে প্রজার উপরে বেজায় চটেন রাজা। তাঁকে দণ্ড দেন। রাজদণ্ড মাথা পেতে নেওয়ার পর দিল্লির সুলতানকে নালিশ করেন সেই প্রজা।

সেই নালিশ শুনেই সেনাপতি জাফর খাঁ গাজিকে (Zafar Khan Ghazi Mosque)  ত্রিবেণীর (Tribeni)  রাজার মোকবিলায় পাঠিয়েছিলেন ফিরোজ শাহ। সেই যুদ্ধে হিন্দু রাজার মৃত্যু হলে ১২৯৮ সালে এই মসজিদ তৈরি করান জাফর খাঁ গাজি (Zafar Khan Ghazi Mosque) । আজীবন এখানেই থেকে গিয়েছিলেন। ১৩১৩ সাল পর্যন্ত তাঁর রাজত্ব চলেছে। তারপর এক হিন্দু রাজার সঙ্গে যুদ্ধে তিনি মারা যান। আর ১৩১৫ সালে গড়ে ওঠে এই দড়গা।

Tribeni
জাফর খাঁ গাজি মসজিদ (Photo Credits: bongmag.com)

মসজিদের মতোই ত্রিবেণীর (Tribeni)  গাজি দড়গার গায়ে রয়েছে মঙ্গলঘট, দেবদেবীর মূর্তি, এমনকী দড়গার ভিতরে সংস্কৃত শ্লোকের শিলালিপিও দেখতে পাওয়া যায়। দরগার দুটিভাগে বিভক্ত। একদিকে তিন পুত্রের সঙ্গে জাফর খাঁ গাজির (Zafar Khan Ghazi)  সমাধি রয়েছে। অন্যদিকে তৃতীয় পুত্র বর খাঁ গাজি, পুত্র বধূ এবং দুই নাতির সমাধি রয়েছে। আরও পড়ুন-Haji Muhammad Mohsin: দানবীর হাজি মহম্মদ মহসীন ও ইমামবাড়া

জানা যায়, বর খাঁ গাজির স্ত্রী ছিলেন হুগলির রাজকন্যা। তিনি গঙ্গার পুজারী। পুত্রবধূর সাহচর্যেই গঙ্গার প্রতি জাফর খাঁ গাজির ভক্তিভাব জন্মায়। বেদব্যাস রচিত গঙ্গাষ্টক স্ত্রোত্র পাঠ করতেন জাফর খাঁ গাজি (Zafar Khan Ghazi Mosque) । বর্তমানে দাঁড়িয়ে এমন ধর্মীয় মেলবন্ধন অবিশ্বাস্য মনে হলেও ৭২৩ বছর আগে বাংলার মাটিতে সেই মৈত্রীই গড়েছিলেন তুর্কিস্তানের ভিনদেশি (Zafar Khan Ghazi) । তাইতো কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী লেখেন, ‘পাজোয়ায় বন্দিয়া যাবে শুভি খাঁ পীরে/ দফর খাঁ গাজিরে বন্দো ত্রিবেণীর (Tribeni)  ধারে’

Tribeni
জাফর খাঁ গাজি মসজিদের আর্বি লিপি (Photo Credits: bongmag.com)

তৎকালীন বঙ্গদেশের এই প্রাচীন স্থাপত্য একবার নিজের চোখে দেখার ইচ্ছে রয়েছে। ৭২৩ বছরের ইতিহাসের সাক্ষী হতে চলে আসুন ত্রীবেণীতে (Tribeni) । হাওড়া কাটোয়া লাইনের ট্রেন ধরে ত্রিবেণী স্টেশনে নামুন। সেখান থেকে অটো বা টোটো ধরে পৌঁছে যেতে পারেন জাফর খাঁ গাজীর দরগায়। অথবা নৈহাটি থেকে জাফর খাঁ গাজির দরগা পর্যন্ত আসছে অটো। গাড়িতে আসতে চাইলে কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করতে পারেন। বাঁশবেড়িয়া পুরসভার মধ্যেই পড়ছে ত্রীবেণী (Tribeni) । আর রাস্তার একেবারে ধার ঘেঁষে রয়েছে শতাব্দী প্রাচীন এই মসজিদ ও দরগা।

Post Author: bongmag

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।