Saptagram Port

Saptagram Port: অতীতের সপ্তগ্রাম ও সৈয়দ জামালুদ্দিন মসজিদ

অবিভক্ত বঙ্গদেশে নদী কেন্দ্রীক সভ্যতার বিকাশ হয়েছে বার বার। কখনও তাম্রলিপ্ত বন্দরকে কেন্দ্র করে বাংলার শিল্প সংস্কৃতি উৎকর্ষতার মান ছুঁয়েছে। তবে নদী বাক পরিবর্তন করতেই সেই তাম্রলিপ্ত বন্দর হারিয়েছে তার নগরীর খ্যাতি, বৈভব। তখন পূর্ণ যৌবনা সরস্বতীর (Saraswati River)  তীরে সেজে উঠছে সপ্তগ্রাম (Saptagram Port) বন্দর। বাসুদেবপুর, বাঁশবেড়িয়া, নিত্যানন্দপুর, কৃষ্ণপুর, দেবানন্দপুর, শিবপুর এবং বলদঘাটি। এই সাতটি গ্রাম নিয়েই ছিল সেদিনের সপ্তগ্রাম (Saptagram Port)।

ফিরে আসি নদী (Saraswati River)  প্রসঙ্গে। উত্তর থেকে প্রবাহিত গঙ্গা পূর্বভারতে প্রবেশের পর বিহারের রাজমহল হয়ে তৎকালীন বাংলায় প্রবেশ করে। মুর্শিদাবাদের ধূলিয়ানের কাছে গঙ্গা দুভাগে ভাগ হয়ে এক দিক পদ্মা নামে বাংলাদেশের উপর থেকে প্রবাহিত হয়েছে। অন্যদিকটা ভাগীরথী নাম নিয়ে হাওড়া, কলকাতা, হুগলি, চব্বিশপরগনা হয়ে সমুদ্রে গিয়ে মিশেছে। আরও পড়ুন-Haji Muhammad Mohsin: দানবীর হাজি মহম্মদ মহসীন ও ইমামবাড়া

হুগলীর ত্রীবেণীর কাছে ভাগীরথীর মূল ধারা তিনভাগে বিভক্ত হয়েছে। একটি শাখানদী ভাগীরথী ও অন্যদুটি যমুনা এবং  সরস্বতী নামে নিজের নিজের গতিপথে এগিয়ে গিয়েছে। হুগলির ত্রিবেণীর যমুনার সঙ্গে এলাহাবাদের যমুনার কোনও মিল নেই। এখানে ভাগীরথীর দক্ষিণ পূর্বে বহমান শাখা নদী হল বাংলার যমুনা। আর দক্ষিণ পশ্চিমে বহমান নদী সরস্বতী (Saraswati River)   । দ্বাদশ ত্রয়োদশ শতকে এই সরস্বতী নদী খুব উচ্ছল।

Saptagram Port: সরস্বতী নদী

ইরান আরব তুর্কিস্তান থেকে তখন বণিকরা এই নদীপথ ধরেই সপ্তগ্রাম (Saptagram Port) বন্দরে বাণিজ্য করতে আসছে। ধীরে ধীরে নগরীর পত্তন চলছে। দিল্লির মসনদে তখন সালতানাত। ততদিনে বঙ্গদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে সপ্তগ্রাম (Saptagram) বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। পরিব্রাজক ইবনবতুতা এই নদী (Saraswati River)   পথেই এক সময় সপ্তগ্রামে (Saptagram)  এসেছিলেন। মনসামঙ্গল কাব্যে আমরা সপ্তগ্রামের (Saptagram) উল্লেখ পাই। চাঁদ সদাগর এই নদীপথেই (Saraswati River)  বাণিজ্যে যেতেন।

Saptagram Port: গৌরবময় সপ্তগ্রাম

সুলতান শাসনাধীন ভারতবর্ষের সপ্তগ্রাম বন্দরে নামীদামী ধাতু বোঝাই জাহাজ ভিড়ত। মহম্মদ বিনতুঘলক যখন দিল্লি থেকে রাজধানী ঔরঙ্গাবাদে সরিয়ে নিয়ে গেলেন তখন এই সপ্তগ্রামে (Saptagram Port) তৈরি করিয়েছিলেন টাঁকশাল। সুলতানি শাসনকালে ভারত বর্ষে রুপো ও স্বর্ণমুদ্রাই প্রচলিত ছিল। রৌপ্য মুদ্রার নাম ছিল আদিল। আর স্বর্ণমুদ্রাকে বলা হত দিনার। তৎকালীন সপ্তগ্রামে (Saptagram Port) ছিল রৌপ্য মুদ্রার টাঁকশাল। এ থেকেই বোঝা যায় সেদিনের সপ্তগ্রাম কতটা সমৃদ্ধশালী ছিল। নদীপথে আরব পারস্য থেকে এখানে আসত সোনা রুপোর মত মূল্যবান ধাতু।

শুধু অর্থ সম্পদই নয় শিক্ষা, শিল্প চারুকলাতেও দারুণ সমৃদ্ধি লাভ করেছিল সেদিনের সপ্তগ্রাম (Saptagram Port)। তবে কালের নিয়মে অতীত হল সপ্তগ্রাম (Saptagram Port) বন্দর। ১৫৫০ সাল নাগাদ ভয়াবহ ভূমিকম্পে বদলে গেল সরস্বতী নদীর (Saraswati River)  জীবনধারা। পলি পড়ে নদীর (Saraswati River)  নাব্যতা কমে এল। পণ্যবাহী জাহাজের বন্দরে ভিড়তে দীর্ঘ সময় নষ্ট হচ্ছে দেখে বিদেশী বণিকরা হুগলী নদীর দিকে ঝুঁকলেন। আরও পড়ুন-Hanseswari Temple: ইতিকথায় হংসেশ্বরী মন্দির ও রাজা নৃসিংহদেব

সেই সরস্বতী নদী (Saraswati River)  আজ খালের চেহারা নিয়েছে। বহুদিন আগেই দখল হয়েছে নদীপথ। গৌরবময় সপ্তগ্রামের (Saptagram Port) ইতিহাস এখনও এলাকার পুরোনো বাসিন্দাদের মুখে মুখে ফেরে। এদিকে পঞ্চদশ শতকে সপ্তগ্রাম (Saptagram Port) যখন ব্যস্ত বাণিজ্যনগরী তখন দিল্লির মসনদে সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ।

সেই সময় সরস্বতী নদী (Saraswati River)  পথেই তুর্কিস্তান থেকে বঙ্গদেশে এলেন সৈয়দ ফকরুদ্দিন আমুলী। তাঁরা ছিলেন কাস্পিয়ান সাগর লাগোয়া তুর্কিস্থানের ছোট্ট শহর আমোলের বাসিন্দা। এই ফকরুদ্দিন আমুলীর পুত্র সৈয়দ জামালুদ্দিন (Sayed Jamaluddin Mosque) ছিলেন পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব। তিনিই ১৫২৯ সালে তৎকালীন সপ্তগ্রামে (Saptagram Port) একটি মসজিদ নির্মাণ করান। বলা বাহুল্য আজকের আদিসপ্তগ্রামে সেদিনের সমৃদ্ধশালী সপ্তগ্রামের স্মারক স্বরূপ টিকে রয়েছে এই টেরাকোটার মসজিদটি।

Saptagram Port
সৈয়দ জামালুদ্দিন মসজিদ (Photo Credits: bongmag.com)

মূলত জামালুদ্দিন মসজিদ (Sayed Jamaluddin Mosque) নামে পরিচিত এই নির্মাণ শৈলীর বেশিরভাগ অংশই কালের গর্ভে বিলীন হয়েছে। জিটি রোডের ধারে ইটের তৈরি পোড়া মাটির কারুকাজের মসজিদটি চোখে পড়ে। প্রবেশপথে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের বোর্ড ঝুলছে। চাতাল পেরিয়ে মসজিদের (Sayed Jamaluddin Mosque) পূর্ব দিকে তিনটি প্রবেশপথ। উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকেও প্রবেশের পথ রয়েছে। পশ্চিম দিকের দেওয়ালটি এখনও অবশিষ্ট। সেই দেওয়ালেই রয়েছে তিনটি মেহরাব। তখনকার দিনে তো আর প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ছিল না। তাই এই মেহরাব থেকে নামাজ পড়াতেন ইমাম সাহেব।

আগেই নিশ্চিহ্ন হয়েছে মসজিদের ছাদ। পশ্চিমদিকে ডান কোণে একটি মিনার এখনও মাথা তুলে আছে। তবে বামদিকের মিনারটি ক্ষতিগ্রস্ত। নামাজের জায়গায় দুটি ব্যাসল্টের ছোটো স্তম্ভ রয়েছে। জামালুদ্দিন মসজিদে (Sayed Jamaluddin Mosque) এই দুই স্তম্ভের ভূমিকা কী ছিল বোঝা গেল না। তবে এখন সেখানে নিয়মিত ধূপ জ্বলে নামাজ পড়া না হলেও প্রার্থনা করতে যে লোকজন এখানে আসেন তা বেশ বোঝা যায়। ৪৯২ বছরের ইতিহাসের সাক্ষী এই একটা গোটা দেওয়াল ও বাকি তিনদিকের প্রবেশপথ। পশ্চিমদিকের দেওয়ালে পোড়া মাটির নকশা চোখে পড়ে। সেখানেই রয়েছে তিনটি মেহরাব।

Saptagram Port: সৈয়দ জামালুদ্দিন মসজিদ

এই মেহরাবের ভিতরে এমন অনেক টেরাকোটার শিল্পকর্ম রয়েছে যা আপনাকে কৌতূহলী করবে। জামালুদ্দিন মসজিদের চৌহদ্দিতে রয়েছে তিনটি সমাধি। মনে করা হয় দুই দিকের সমাধিতে শায়িত সৈয়দ ফকরুদ্দিন ও তাঁদের পরিবারে খোঁজা এবং মাঝের সমাধিতে ঘুমিয়ে আছেন জামালুদ্দিনের (Sayed Jamaluddin Mosque) মা। লাগোয়া ডুমুর গাছে মনস্কামনা পূরণে বাঁধা রয়েছে রংবেরঙের কাপড়ের টুকরো।

Saptagram Port
সৈয়দ জামালুদ্দিন মসজিদ (Photo Credits: bongmag.com)

এই সমাধিস্থলকে ঘিরে রয়েছে ফার্সি অক্ষরে লেখা ব্যাসল্ট ফলক। এমনকী সমাধি স্থলের সামনেও রয়েছে বেশ কয়েকটি ব্যাসল্ট ফলক। এগুলি কোথা থেকে এসেছে জানা না গেলেও এর একটিতে বলা আছে, ১৪৬৩ খ্রিস্টাব্দে মাহমুদ শাহের রাজত্বকালে বাংলায় তরবিয়ত খান নামের এক ব্যক্তি মসজিদ তৈরি করিয়েছিলেন। সেই নির্মীয়মান মসজিদের কথা রয়েছে ফলকটিতে। আর অন্যটিতে রয়েছে ১৪৯৪ খ্রিস্টাব্দে জনৈক ফতেহ সাহেবের সময়ে তৈরি হওয়া অন্য একটি মসজিদের কথা। আরও পড়ুন-Susanna anna maria varkark: চুঁচুড়ার ওলন্দাজ ইতিহাসের স্মারক সুস্যানা আন্না মারিয়ার ভারকার্কের সমাধি

কিন্তু এই দুটি মসজিদ সপ্তগ্রামের (Saptagram Port) ঠিক কোথায় ছিল বা আদৌ আজ আর সেগুলো আছে কিনা তার কোনও বিশদ তথ্য নেই। এমনকী এই মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ জামালুদ্দিন (Sayed Jamaluddin Mosque) সম্পর্কেও বিশেষ কিছুই জানা যায় না। সময় ও ভূমিকম্প শুধু নদীকেই (Saraswati River)  ইতিহাস করে দেয়নি। একটা প্রাণপ্রাচূর্যে পূর্ণ নগরসভ্যতাকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে।

সেদিনের সপ্তগ্রাম (Saptagram Port) আর একুশ শতকের আদিসপ্তগ্রাম যেন দুই মেরুর দুই বাসিন্দা। সরস্বতী নদীর (Saraswati River)   ভাগ্য বদল না হলে আজকের পশ্চিমবঙ্গে শহর কলকাতা নয়, একদা বন্দর নগরী সপ্তগ্রামের (Saptagram Port) কৌলিন্য অক্ষুণ্ণ থাকত। বহমানতা যে শুধু প্রাণচঞ্চলতাকে ধরে রাখে এমন নয়, সমৃদ্ধিকেও ধরে রাখে। একুশ শতকের আদি সপ্তগ্রাম যেন সেদিনের গৌরবময় ইতিহাস বুকে নিয়ে নিস্তরঙ্গ জীবন কাটাচ্ছে।

সপ্তগ্রাম বা আজকের আদি সপ্তগ্রামের ঐতিহাসিক জামালুদ্দিন মসজিদ দেখতে হলে হাওড়া থেকে মেন লাইনের বর্ধমান লোকাল ধরে চলে আসুন আদি সপ্তগ্রাম স্টেশনে। সেখান থেকে টোটোতে পৌঁছে যান জামালুদ্দিন মসজিদ ও সরস্বতী নদী।  এছাড়া ব্যান্ডেল স্টেশনে নেমে টোটো বা অটো করেও পৌঁচাতে পারেন জামালুদ্দিন মসজিদে। কলকাতা থেকে গাড়িতে জিটিরোড ধরে চলে আসুন আদি সপ্তগ্রামের জামালুদ্দিন মসজিদ।

Post Author: bongmag

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।