Holi

দোল বনাম হোলির বিড়ম্বনা, কোন রঙে ফিরছে মন?

হোলিতে মেতে উঠেছে বাঙালি। শুধু বাঙালিই বা বলি কেন রঙের উৎসবে বর্ণিল গোটা ভারতবর্ষ। এবার প্রশ্ন উঠতে পারে হোলি আবারি কি, দোল বলুন না। বাঙালির প্রিয় বসন্ত উৎসব তো কবিগুরুর হাত ধরেই এসেছে, তার আগে লোকজন দোল খেলত। বিভিন্ন ভাষাভাষির দেশ ভারতে দোলের রীতি রেওয়াজও বর্ণময়। তাই অবাঙালিরা আজকের দিনে হোলিতে মেতে ওঠেন। অন্যদিকে মায়াপুরের দোল কিন্তু পুরোপুরি ধর্ম কেন্দ্রিক। শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসব আবার অনেকটা মিলন মেলার মতো। স্থান ভেদে দোলের রূপ বৈশিষ্ট সবই বদলেছে। তবে আক্ষরিক অর্থটা একই থেকে গিয়েছে। এই ডামাডোলের বাজের এক মুঠো রং যদি খুশি আনে, ক্ষতি কি!

আশপাশের সকলকে রঙীন করে দেওয়ার যে ইচ্ছে তা এই প্রতিটা ক্ষেত্রেই সমানভাবে লক্ষ্য করি। ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশে হোলির প্রচলন থাকলেও দোল বা বসন্ত উৎসবের কিছু দেখবেন না। কিন্তু বাংলায় দোল পাবেন, শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসবের রূপ রাজ্যের অনেক জায়গাতেই দেখা যায়। সঙ্গে হোলিও। সমস্ত উৎসবের মূল কথা ভাল থাকা, আনন্দে থাকা, অন্যকে আনন্দে রাখা, সঙ্গে মিষ্টিমুখ। কিন্তু আমরা এমন এক অস্থির সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি যে সেই ভাল থাকাতেই টান পড়েছে। দোল বা হোলির মতো বর্ণময় উৎসবও তাই আজ আমাদের রঙীন করতে পারে না। আরও পড়ুন-স্বস্তিকাদি গাইছেন “নিবিড় অমা তিমির হতে বাহির হল”, গৌর প্রাঙ্গণের আকাশে তখন মেঘ সরে চাঁদ উঠছে__ এভাবেই আমার বসন্তকে দেখা

কোথাও যেন একটা ভীতি তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। বন্ধুকে দেখতে পেয়ে একমুঠো রঙে তাকে রাঙিয়ে দেওয়ার ইচ্ছেটা কয়েক বছর আগেও ছিল। আজ যেন তা নেই। বহুদিন পর দেখা হলে রং দিতে কেমন বাধো বাধো ঠেকে। কি ভাববে, অ্যালার্জি নেই তো? বহুদিন পর চুটিয়ে আড্ডা দিতে গিয়েও বাধা। মতাদর্শে মিল না থাকতেই পারে, কিন্তু তা বলে আলোচনা হবে না এমনটা তো নয়। তবে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এমন একটা জায়গায় নিয়ে গিয়ে আপনাকে ফেলেছে, যে চাইলেও নিজের মতো করে কিছু বলতে পারবেন না, কোনও রঙে রেঙে আপনাকে বলতে হবে। নিজে রং নাই বা মাখলেন, অন্যরা দায়িত্ব নিয়ে মাখিয়ে দেবে। তারপর শুরু হবে সমালোচনা, সেই সমালোচনা যে কতক্ষণে কুৎসায় গিয়ে পৌঁছাবে তা কেউ জানে না।

এখন চারদিকে শুধু রঙের ছড়াছড়ি, তাই দোল বা হোলি আলাদা করে আর তেমন রঙীন হয়ে উঠতে পারে না। প্রতিমহূর্তে দ্বিধা দ্বন্দ্বের লড়াই চলছে। আপনাকে কোনও একটা পক্ষ বেছে নিতেই হবে। সাদাটা সাদা আর কালোটা কালো দেখার সুযোগ হারিয়েছেন। বর্তমান প্রেক্ষাপট, এই তত্ত্বে বিশ্বাস করে না। জোর করে চাপিয়ে দেওয়া রঙের ভারে যখন কাহিল তখন দোল বাহুল্য বইকি, হাস্যকরও ভাবতে পারেন। নতুন চাকরি পেয়েছেন, মন দিয়ে কাজ করে নিজের একটা পরিচয় তৈরি করতে চাইলেন। দেখবেন কত উটকো ঝামেলা জুটেছে। সহকর্মীরা কেউ সমালোচনায় বিদ্ধ করবে কেউবা বিপাকে ফেলার চেষ্টা করবে। ধনেপ্রাণে বাঁচতে চাইলে নিজের সত্ত্বাটুকুকে বিসর্জন দিয়ে দলে ভিড়ে যান। আর বিপদ নেই, আপনি যে তাঁদের রঙের হয়ে গেলেন। আরও পড়ুন-‘দোল পূর্ণিমার আলো মেখে হাসছে আশ্রম মাঠ, নাচে গানে জমে উঠেছে আড্ডা’__ ফিরে দেখা বসন্ত উৎসব

বস লোকটা ভাল, ফাঁকি না মেরে কাজ করছেন। ভালই চলছিল, ম্যানেজিং কমিটির মিটিঙে ভাল কাজের জন্য ডাক পড়ল। নতুন কোনও কনসেপ্ট শেয়ার করলেন। বৈঠকে উপস্থিতি কর্তাব্যক্তিরা যখন আপনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ, তখন দেখলেন বসের মুখ ভার। ভেবেছিলেন প্রোমোশন জুটবে, পরের দিন অফিসে এসে দেখলেন হাওয়া গরম। সহকর্মীরা ফিসফিস করছে, কাজ দেখাতে বিপদে পড়েছ বেচারা। আমাদের মতো থাক, তা না। এবার গেল তো সব। একেবারে হাতে বাটি ধরিয়ে দিল রে। সেকেন্ড হাফে ডাক পড়ল। দুরু দুরু বুকে বসের কিউবিকলে ঢুকে দেখলেন তিনি বেশ খোশ মেজাজে আছেন। ফোনে বার্তালাপ চলছিল ইশারায় বসতে বললেন। মিনিট তিনেক দম আটকে দম আটকে বসে থাকার পর বসের মিটিমিটি হাসি। এরপরই একটা সাদা খাম চলে এল আপনার হাতে, সঙ্গে নির্দেশ, বাড়ি গিয়ে খুলবেন।

গোটা দিন সহকর্মীদের জ্বালা ধরানো নজর উপেক্ষা করে ফাইলেই মুখ গুঁজে কাটিয়ে দিলেন। বাড়ি ফিরে খাম খুলতেই চক্ষু স্থির। পদোন্নতি নয়, বদলির অর্ডার। উত্তরবঙ্গের এক মফঃস্বলে তাঁকে বদলি করা হয়েছে। ফের রং পড়ল আপনার মুখে, অপমানের রং। এতটাই গাঢ় দ্রবণ যে রংটা ঢালা হয়েছিল মাথায়, সেখান থেকে কপাল বেয়ে কান ঘেঁষে চোখ বাঁচিয়ে ঠোঁটে গালে গলায় শার্টে পড়তে থাকল রঙ। মুখটা তেতো হয়ে গেল। জীবনের শুরুতেই শুধু নয় প্রতিটা বাঁকে বাঁকে মাখতে হবে রং, কোথাও লজ্জার, কোথাও অসম্মানের কোথাও বা অপমানের। মাঝে মাঝে ভয়ের রং আপনাকে হুমকি দেবে। গা বাঁচিয়ে চলতে শিখ যাবেন একদিন। তখন থেকে ভালমানুষির রং মাখা শুরু হবে। প্রতিবাদীদের ভিড়ে নয়, মোসাহেবদের জটলায় আপনাকে খুঁজে পাওয়া যাবে। আরও পড়ুন-ফেলে আসা মেয়েবেলা ও মন কেমনের বসন্ত উৎসব

এত রঙের ভিড়ে যখন ছেলেবেলার বন্ধুর হাতটা কাঁধ ছোঁবে, তখন যেন মুখ ফিরিয়ে থাকবেন না। ওটাই একমাত্র ফেরার পথ। যেখানে এখনও পলাশ ফোঁটে গন্ধ ছড়ায় বকুলবিথি। তাই এই বসন্তে আবীরের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে চলতে চান ক্ষতি নেই, মনের রঙে নিজেকে রাঙিয়ে ফেলুন। যতদিন বাকিদের হাত থেকে এমন রেঙে থাকতে পারবেন, ততদিনই হোলি, থুড়ি বসন্ত।

Post Author: bongmag

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।