Kash Flower

কাশের বনে লাগল দোলা, উমা আসে বাপের বাড়ি…

সুহিতা অফিস থেকে ফেরার পথেই সেই ফোনটা পেয়েছিল। প্রতিবার পুজো এলে এই ফোনের অপেক্ষাটা সে করে, এবারও তার ব্যাতিক্রম হয়নি। তাইতো আজ তাড়াতাড়ি বেরিয়েছে, মণি স্কয়্যার মলের সামনে শাশ্বত তার অপেক্ষায় আছে। তারপর দুজনে মিলে একটু খাওয়াদাওয়া আর কেনাকাটা। মধ্যবিত্ত মানসিকতাকে লালন করে চলা সুহিতা আজ শপিংমল থেকেই জামাকাপড় কিনবে, এই বিলাসিতা তার ভালবাসা, অহঙ্কার নয়। ওই তো শাশ্বত, বাস থেকে নেমে তড়িৎ গতিতে এগিয়ে যায় সে। একবছরে তেমন বদল না হলেও বেশ স্বাস্থ্য হয়েছে ছেলেটার, নিজে যে মুটিয়ে যায়নি তা নয়। তবে শরীরচর্চার মধ্যে থাকায় ততটা বোঝা যায় না। আজই তো বাসে এল, নাহলে অফিস থেকে ফেরার সময় সল্টলেক থেকে হেঁটে ফুলবাগান চলে আসে।



অ্যাকাউন্টসের নমিতাদি প্রথম যেদিন এই হাঁটার গল্প শুনলেন, সেদিন তো একেবারে ভিরমি খাচ্ছিলেন। সব শুনে বলেই ফেললেন ধন্যি মেয়ের অধ্যাবশয়। কী করবে সুহিতা! তাকে তো টানে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, আদরের কবি। ছাইপাঁশ ভাবত ভাবতে কখন যে কিডস জোনে চলে এসেছে খেয়াল নেই। দায়িত্বে থাকা মহিলা যখন গোলাপি বার্বি ফ্রকটার গুনাগুন শুরু করলেন তখনই চমক ভাঙলো। প্রয়োজন নেই বলে বেশ খানিকটা এগিয়ে গেল সুহিতা। গুনগুনটা তো গতবছর অস্টমীতেই চলে গেল। ডেঙ্গি যে আজকাল মফস্বলেও মহামারীর আকার নিয়েছে তা মানুষ কবে বুঝবে কে জানে। কী হল কিছুই পছন্দ হচ্ছে না, নাকি মুড নেই? শাশ্বতর কথায় বাস্তবে ফিরল সুহিতা। হাত চালিয়ে খান কতক শার্ট, জামা প্যান্টের সেট পছন্দ করে কাউন্টারের দিকে পা চালাল। নির্বিকার ভাব দেখে সুহিতাকে আর বিশেষ ঘাটাল না শাশ্বত, বুদ্ধিমান ছেলে।



বিলিং লাইনে দাঁড়িয়ে সুহিতা, বার বার ঘড়ি দেখছে। হালকা গোলাপী রঙা কুর্তির সঙ্গে কালো লেগইনস, হাতে বাদামি স্ট্র্যাপের ঘড়ি, মধ্যমায় ঝলক মারছে হিরে। ঘাড় ঘোরাতে কানেও দুকুচি হিরে ঝলসে উঠল। সযত্নে লালিত চুল খানিকটা ওয়েভি। না না পার্লারচর্চিত নয়, সেই শৈশব থেকেই সুহিতাকে চেনে কিনা। একইরকম আছে ছিপছিপে, নিশ্চই প্রেমিকের সঙ্গে অনুরাগের পালা চলছে, তাই মুখভার। আচ্ছা তারা কি বন্ধু? কিন্তু তাই বা কী করে হবে, বছরে তো মোটে দুদিন দেখা হয়। পুজোর আগে, আর মহালয়ার দিন। এই দুদিনে আর কতটাই বা দূরত্ব ঘোচানো যায়। তবুও জেনারেশন নেক্সটের হাওয়ায় স্বার্থপরতার গন্ধ থাকলেও সুহিতাকে তা স্পর্শ করেনি। তাইতো আজও পুজো এলে সেই ছেলেবেলার মতোই দুজনে হাত ধরে হরিদাসপুরের আজানতলায় পা রাখতে পারে।



কোনও এক কালে বানের জলে ভেসে এসেছিল অজানা এক গাছ, গরীবগুর্বো বাসিন্দারা সেই গাছই পুঁতে দেন খালপাড়ে, প্রকৃতির কোলে একদিন বীরদর্পে মাথা তুলে মহীরূহে পরিণত হয় সেই ছোট্ট চারা। গাছের গুঁড়ি ঘিরে সিমেন্টের বেদি তৈরি হল, সকাল বিকেল আড্ডা, পরে এলাকার উন্নতি হলে অটোস্ট্যান্ড হল। সেই বেদিই এখন প্রতীক্ষালয়। মেশিনভ্যান থেকে নেমে দুমিনিট জিরিয়ে নিল সুহিতা, অনুমতি নিয়ে সিগারেট ধরাল শাশ্বত, অফিসের বাগচিদা প্রায় জোর করেই এই বদঅভ্যেসটা ধরিয়ে দিয়েছেন। ছাড়ব ছাড়ব করেও কেমন যেন অভ্যেসের দাস হয়ে উঠছে শাশ্বত। দশটাকা দেন দিদি বচ্ছরকার দিন, তাহলে পালিতবাড়ি দিয়ে আসি। বুড়িটা তো এই বর্ষায় মরল, বাচ্চাগুলোকে রেখে পালিতবউ আর কলকেতায় কাজে যেতি পারে না। ফসলের সময় মুণিষ খাটল, পুজোতে বারোয়ারিতলায় জোগাড় দেবে। কেলাবে তো থিমের পুজো সেখানে নাকি আল্পনা এঁকিছে। তা ভারী সুন্দর, আসছে বছর পাশের গ্রামের বড় পুজোয় তাকে নে যাবে, আল্পনা আঁকার জন্যি। তা ভগমান এতদিনে মুক তুলে তাকিয়েছে। ভ্যানওয়ালার বকর বকর শুনতে শুনতেই চণ্ডীমণ্ডপ, বুড়ির থান পেরিয়ে গেল চোখের নিমেষে। বারোয়ারি তলার মাঠে এখনও বর্ষার জল, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তাতেই নেচে বেড়াচ্ছে, বাঁশ বাঁধা হচ্ছে। ভ্যান গিয়ে থামল ছোটপুকুর পাড়ের কোণে, এখান থেকে হেঁটেই যেতে হবে সুহিতাদের। সান্যালবাড়ির গেটে মনোহারির দোকান সাজিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি ঠ্যালা। সেটিকে ঘিরে পাড়ার বউ ঝিদের ভিড় উপচে পড়েছে। আচমকা ছোঁয়ায় ঘাড় ঘোরাল সুহিতা। হেয়ারব্যান্ড নিয়ে মায়ের হাত ধরে এগিয়ে চলেছে একটা পুঁচকি। ঝট করে মিলিয়ে গেল গুনগুনের হাসিমুখ। গত পুজোয় ভ্যানের আওয়াজ পেয়েই সে দৌড়ে এসেছিল, শয্যাশায়ী ঠাকমা যে বলেছিল তাকে সুই দিদি নতুন জামা আনবে। রতনও বোনের হাত ধরে পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়েছিল। এবার একা একাই হাঁটতে হবে।



পালিতবাড়ির উঠোনে ছোটখাটো ভিড়, যমুনাকে ঘিরে জটলা। ভিড়ের মধ্যে থেকে আওয়াজ এল এসিছে এসিছে। ফি বছর রমাবউয়ের শাড়ি, তিন ছেলে মেয়েকে নতুন জামাকাপড় দেয় সুহিতা শাশ্বত। একসময় এই গ্রামেই থাকত তারা, শাশ্বতর বাবা ছিলেন সেচ দপ্তরের কর্মী। হরিদাসপুরেই রয়েছে বড় ক্যানাল বর্ষাতে তা ফুলে ফেঁপে উঠত। লকগেট কবে খোলা হবে জানতে চাষিরা রীতিমতো শাশ্বতদের বাংলোর হাতায় হত্যে দিয়ে পড়ে থাকত। আর সুহিতার বাবা ছিলেন বনাধিকারিক, কাছেই হাতিদের একটা করিডর আছে, রায়বাবু মানে সোমেশ রায় সুহিতার বাবা, তাঁকে মাঝে মাঝেই গ্রামে আসতে হত। লাগোয়া জঙ্গলে ব্রিটিশ আমলের পেল্লায় বাড়ি। সেখানেই থাকত সুহিতারা। পালিতবউয়ের শ্বশুর শাশুড়ি আর স্বামী সুহিতাদের বাংলোর দেখাশোনা করতেন। সোমেশ রায়ের সঙ্গে এই গ্রামেই একবার নির্মল মুখুজ্জের আলাপ হয়। শাশ্বতর বাবা, গণ্ডগ্রামে সোমেশবাবুকে পেয়ে একটু নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন নির্মল মুখুজ্জে। সেই থেকেই দুই পরিবারের ভাব। প্রথমটায় শাশ্বতকে পাত্তা না দিলেও সে-ই ছিল সুহিতার একমাত্র খেলার সাথী, একটা সময় সোমেশবাবু বদলি হয়ে উত্তরবঙ্গে চলে গেলেন। সুহিতা তখন ক্লাস সিক্স, রাম পালিত গত হয়েছেন ততদিনে। যমুনা বউ হয়ে এসেছে। যাওয়ার দিন রমাবউ কেঁদে ভাসাল ইন্দ্রাণীদেবীর আঁচল। সোমেশবাবু তখন কথা দিয়েছিলেন, তাইতো পুজো এলেই শাশ্বতকে সঙ্গে করে পালিত বাড়িতে আনন্দ নিয়ে আসে সুহিতা। সে-ই তো এদের দুগ্গা মা। তাদের দেখে যমুনার চোখের কোলে জলের ধারা, আজ আর কেউ নেই যে দিদিমণি। দাওয়ায় উবু হয়ে বসে মাটিতে নখ খুটছে রতন। চুলটা ঘেঁটে দিল শাশ্বত। যমুনার হাতে গুনগুনের ছবি, গত পুজোয় উপহার দিয়েছিল সে। মায়ের কোলে আদুরে গুনগুন, এবার শুধুই ছবি।

Post Author: bongmag

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।