Chandannagar procession

বিদায় বেলায় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী, রাতভর যেন রূপকথার জাল বোনে গঙ্গার পাড়ের এই শহর

সকাল থেকেই মনে যেন বিদায়ের সুর। বুধবার বেলাতেই দশমী তিথি শুরু হয়ে গিয়েছে। বনেদি বাড়ির ঠাকুর বিসর্জন হয়ে গিয়েছে গতকালই। এবার নজরে বারোয়ারি, এসে গেল বিদায়ের ক্ষণ। এবছরের মতো জগ্ধাত্রীকে বিদায় জানাতে সেজে উঠেছে চন্দননগর। সেখানকার বারোয়ারির প্রতিমার শোভাযাত্রা নজর কাড়া। হেলাপুকুর ধার থেকে শুরু করে আদি মা, তেঁতুল তলা, অম্বিকা, খলিসানি, কলপুকুর ধরা, কলুপুকুর, বাগবাজার। কাকে ছেড়ে কার কথা বলি। প্রত্যেক বারোয়ারির তরফেই লরি ভাড়া করে তার উপরে প্রতিমা তোলা হয়। এরপর চলে সাজগোজ। জগদ্ধাত্রীকে দেখতে তখন কাতারে কাতারে লোক নেমেছে চন্দননগরের রাস্তায়। জমকালো বিদায়বেলা নাহলে কী মানায়? এই আনন্দের অবসরেই যেন নিরঞ্জনের দুঃখ লুকিয়ে আগামী বছরের জন্য দিন গুনতে শুরু করে চন্দননগর। আরও পড়ুন-চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী প্রতিমার কাঠামো পুজো হয় দুর্গা দশমীতে, পুজোর কয়েকদিনের অনুভূতি অসামান্য

ফিরে আসি শোভাযাত্রা প্রসঙ্গে। সন্ধ্যা ছটা বাজতেই এক এক করে বারোয়ারির মণ্ডপ খালি করে জগদ্ধাত্রী প্রতিমার যাত্রা শুরু হবে। ততক্ষণে আলোর মালায় সেজে উঠেছে প্রতিটা লরি। প্রতিমা আলো সবই দারুণ মনোমুগ্ধকর। অনেকটা যেন ব়্যাম্পের ফ্যাশন শো, কাকে ফেলে যে কাকে দেখব বুঝতে পারি না। প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার রাস্তায় চলে শোভাযাত্রা। এই অনুষ্ঠানের ক্রেজ এত বেশি যে রাস্তার দুপাশে রীতিমতো চেয়ার বিক্রি হয়। আপনিও সকাল সকাল পৌঁছে গিয়ে একটা চেয়ার দখল করে বসে পড়তে পারেন। তারপর একে একে সব মনোমুগ্ধকর প্রতিমার বাহন আপনার সামনে থেকেই যাবে। হাঁ করে দেখতে দেখতে খেয়ালই থাকে না কখন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামে। বাগবাজারের প্রতিমা আসছে দূর থেকেই বোঝা, যায় লরির সামনে বিরাট বেলুন উড়তে থাকে। আবার গত কয়েকবছর ধরে লরি ছেড়ে বড়সড় ট্রলিতে করে প্রতিমার শোভাযাত্রায় অংশ নিচ্ছে হেলাপুকুর ধার। এবার তাদের ৫০ বছর পূর্তি। প্রতিমা, মণ্ডপে দারুণ চমক ছিল। বেশ বোঝা যাচ্ছে শোভাযাত্রাতেও চমকের বন্দোবস্ত করে রেখেছে এই পুজো কমিটি। এই বিরাট শোভাযাত্রাতে প্রচুর বিদ্যুতের প্রয়োজন। সেসব আসে হাওড়া থেকে। সেখানেই রয়েছে ব্যাটারির লিংক। সঙ্গে তেলের খরচও বিরাট অংকের। একটা লরি এখান থেকে রাজস্থান চলে যাবে, এত টাকার তেল এই শোভাযাত্রার বাহনে লাগে। আরও পড়ুন-‘আলো নিয়ে চন্দননগর আজ যা ভাবছে, গোটা দেশ তা ভাববে আগামী বছর’

যাঁরা চেয়েও চন্দননগরের সুবিখ্যাত জগদ্ধাত্রী পুজো এই কয়েকদিনে দেখতে আসার সময় করে উঠতে পারেননি, তাঁদের কাছে আজ সুবর্ণ সুযোগ। দেরি না করে এইবেলা চলে আসুন স্ট্র্যান্ডের কাছে। খুঁজেপেতে পছন্দসই জায়গায় চেয়ার নিয়ে নিন। দাম মিটিয়ে উপভোগ করুন এই বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। ভারতবর্ষের লোকাচার, পুজো পার্বণ হয়তো প্রবাসী বাঙালিদের কল্যাণে অনেকটাই বিশ্বায়নের গণ্ডী ছুঁয়েছে। তবে মাঝে মাঝে মনে হয়। পার্বণপ্রিয় বাঙালির উৎসব যদি হলিউডি ছবির সিকোয়েন্স হত তাহলে হয়তো চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজো হয়ে উঠত বিদেশি পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। পুজোর সময় একদা ফরাসী কলোনি ভরে উঠত ভ্রমণ পাগল বিদেশিদের আস্তানায়। তবে সে দিন আসতে হয়তো দেরি নেই। কেউ না কেউ নিশ্চই এতদিনে এই পর্যটক টানার কাজটি শুরু করে দিয়েছেন। অচিরেই তার প্রমাণ মিলবে। এত রং, রস, রূপ, শিল্প সৌকর্যের এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন আর কোথায় আছে। প্রতিমার গড়ন থেকে সাজগোজ, মণ্ডপের অনিন্দ্যসুন্দর সজ্জা, উপরি পাওনা হিসেবে এমন বর্ণময় আলোকিত শোভাযাত্রা। হলফ করে বলতে পারি, এই প্রেক্ষাপটে কোনও ছবির শুটিং হলে তার বাজার হবে বিশ্বমানের। বিদেশি দর্শকরা একেবারে মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখবেন, বাঙালি তার ঐতিহ্যকে কীভাবে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আরও আকর্ষণীয় ও মনকাড়া করে চলেছে। আরও পড়ুন-রবিবার বিকেল থেকে গোটা রাত চন্দননগর হয়ে যাক, রইল জগদ্ধাত্রী পুজোর রুট ম্যাপ

যাকগে এসব ভাবনার অংশ, যেদিন বিশ্ব সিনেমার মঞ্চে আলোকিত হবে, সেদিন না হয় বাকিটা বলব। আজ তোলা থাক। ফের শোভাযাত্রায় ফিরলাম, ততক্ষণে তেঁতুলতলা, খলিসানির প্রতিমা অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে, চোখ যেন সরছে না। পিঠে চিনচিনে ব্যথা জানান দিল, অনেক তো হল এবার কোমর তোলো। ওমা, পূব আকাশ যে ফর্সা হয়ে এল। একে একে গঙ্গার ঘাটে এগিয়ে চলেছে প্রতিমা। শুরু হয়ে গিয়েছে নিরঞ্জনের পালা। জমকালো লরি ছেড়ে তখন গঙ্গার ঘাটে বারোয়ারির ভিড়। গয়নাগাটি, ফুলমালা সরিয়ে চলছে নিরঞ্জন। বলে রাখা ভাল, নিরঞ্জনের পরেই কিন্তু বারোয়ারির কর্তারা ফিরে আসেন না। নিজেদের কাঠামো থেকে প্রতিমাকে আলাদা করা হয় কেটে কেটে। এভাবেই গঙ্গায় মিলিয়ে যায় মাটি। ওই দিনই শূন্য ঘরে ফিরে আসে কাঠামো। তখনও ফাঁকা মণ্ডপে জ্বলছে প্রদীপ, বাতাসে বিষাদের সুর। জলে ভেজা কাঠামো সেই মন খারাপের মাঝেই ফের আগামীর বার্তা দেয়। ইত্যবসরেই বিভিন্ন প্রতিমা, মণ্ডপ ও আলোকসজ্জা দেখে পরের বছরের মৌখিক বায়নাও করে ফেলেন পুজোকর্তারা। সর্বোপরি আমরা মানুষ তো, সময়ের দাস। ফের দিন শুরুর সঙ্গে সঙ্গে মন খারাপ সরিয়ে রেখে নতুন করে পথচলার সূচনা হয়। পাশের গলি থেকে ততক্ষণে স্লোগান উঠেছে আসছে বছর আবার হবে। যেন রূপকথার একাঙ্ক নাটকের শেষ, এবার ঘরে ফেরার পালা। মাঝিভাই ততক্ষণে শ্যামনগর অভিমুখে দ্বার টানা শুরু করেছেন, স্টিমারের ভোঁ বেজে উঠল। কর্মব্যস্ত একটা সকাল যেন হুড়মুড়িয়ে বাস্তবে ফেরে। শুরু হয় দিনগত পাপক্ষয়ের নতুন কড়চা।

Post Author: bongmag

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।